Wednesday, October 7

সপ্তাহের দিনগুলোর মধ্যে জুমা বা জুমাবার অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ও ফজিলতপূর্ণ একটি দিন। মুমিনের জীবনে আত্মশুদ্ধি, ইবাদত-বন্দেগি, দোয়া ও আল্লাহর রহমত-মাগফিরাত লাভের বিশেষ সুযোগ নিয়ে আসে এই পবিত্র দিন। ইসলামে জুমার দিনের গুরুত্ব, এর ঐতিহাসিক তাৎপর্য এবং এ দিনের বিশেষ আমল সম্পর্কে কোরআন-হাদিসে বিভিন্ন নির্দেশনা ও ফজিলত বর্ণিত হয়েছে।

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

نَحْنُ الآخِرُونَ السّابِقُونَ يَوْمَ القِيَامَةِ، بَيْدَ أَنّهُمْ أُوتُوا الكِتَابَ مِنْ قَبْلِنَا، ثُمّ هَذَا يَوْمُهُمُ الّذِي فُرِضَ عَلَيْهِمْ، فَاخْتَلَفُوا فِيهِ، فَهَدَانَا اللهُ، فَالنّاسُ لَنَا فِيهِ تَبَعٌ

অর্থ: ‘আমরা পরে আগমনকারী, কিন্তু কিয়ামতের দিন অগ্রগামী হব। আমাদের আগে অন্যদের কিতাব দেওয়া হয়েছিল। এই দিনটি তাদের ওপর ফরজ করা হয়েছিল; কিন্তু তারা এতে মতবিরোধ করেছে। অতঃপর আল্লাহ আমাদের এ দিনের পথ দেখিয়েছেন।’

(সহিহ বুখারি, ৮৭৬; সহিহ মুসলিম, ৮৫৫)

জুমার দিনের বিশেষ বৈশিষ্ট্য

হাদিসে জুমার দিনকে সপ্তাহের শ্রেষ্ঠ দিন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। হজরত আবু লুবাবা ইবনে আবদুল মুনজির (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

إِنّ يَوْمَ الْجُمُعَةِ سَيِّدُ الْأَيّامِ وَأَعْظَمُهَا عِنْدَ اللهِ

অর্থাৎ, ‘নিশ্চয়ই জুমার দিন সব দিনের সর্দার এবং আল্লাহর কাছে সবচেয়ে মহান দিন।’

হাদিসে জুমার দিনের কয়েকটি বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এ দিন হজরত আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করা হয়েছে, তাঁকে পৃথিবীতে অবতরণ করানো হয়েছে এবং তাঁর ওফাত হয়েছে। এ দিন কিয়ামত সংঘটিত হবে। একই সঙ্গে জুমার দিনে এমন একটি বিশেষ সময় রয়েছে, যখন কোনো মুমিন বান্দা আল্লাহর কাছে দোয়া করলে—হারাম কোনো বিষয়ের প্রার্থনা না হলে—আল্লাহ তা কবুল করেন।

(মুসনাদে আহমাদ, ১৫৫৪৮; ইবনে মাজাহ, ১০৮৪)

জুমার রাতে আমল পেশের বর্ণনা

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

إِنَّ أَعْمَالَ بَنِي آدَمَ تُعْرَضُ كُلّ خَمِيسٍ لَيْلَةَ الْجُمُعَةِ

অর্থ: ‘বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে, অর্থাৎ জুমার রাতে আদম সন্তানের আমল পেশ করা হয়। তখন আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারীদের আমল কবুল করা হয় না।’

(মুসনাদে আহমাদ, ১০২৭২; আদাবুল মুফরাদ, ৬১২)

জান্নাতবাসীদের জন্য ‘ইয়াউমুল মাজিদ’

জুমার দিনের মর্যাদা শুধু দুনিয়াতেই সীমাবদ্ধ নয়; জান্নাতেও এ দিন বিশেষ আনন্দ ও সম্মানের সঙ্গে পালিত হবে—এমন বর্ণনা হাদিসে এসেছে।

হাদিসের বর্ণনায় জুমার দিনকে ‘ইয়াউমুল মাজিদ’ বা মহা প্রাপ্তির দিন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। জান্নাতবাসীরা এ দিনে আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি লাভ করবে। তারা আল্লাহর প্রশংসা করবে এবং তাঁর সন্তুষ্টি কামনা করবে। আল্লাহ তাআলা তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হওয়ার ঘোষণা দেবেন।

(মুসনাদে আবু ইয়ালা, ৪২২৮; তাবারানি)

এক জুমা থেকে আরেক জুমা গুনাহের কাফ্ফারা

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

الْجُمْعَةُ إِلَى الْجُمْعَةِ، كَفّارَةٌ لِمَا بَيْنَهُنّ، مَا لَمْ تُغْشَ الْكَبَائِرُ

অর্থ: ‘এক জুমা থেকে আরেক জুমা মধ্যবর্তী সময়ের গুনাহের জন্য কাফ্ফারা, যদি কবিরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা হয়।’

(সহিহ মুসলিম, ২৩৩; ইবনে মাজাহ, ১০৮৬)

জুমার নামাজে মনোযোগের ফজিলত

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

مَنْ تَوَضّأَ فَأَحْسَنَ الْوُضُوءَ، ثُمّ أَتَى الْجُمُعَةَ، فَاسْتَمَعَ وَأَنْصَتَ، غُفِرَ لَهُ مَا بَيْنَهُ وَبَيْنَ الْجُمُعَةِ، وَزِيَادَةُ ثَلَاثَةِ أَيّامٍ

অর্থ: ‘যে ব্যক্তি উত্তমরূপে অজু করে জুমায় উপস্থিত হবে, মনোযোগ দিয়ে খুতবা শুনবে এবং নীরব থাকবে, তার দুই জুমার মধ্যবর্তী সময়ের গুনাহ এবং আরও তিন দিনের গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।’

(সহিহ মুসলিম, ৮৫৭)

জুমার দিনের বরকতময় আমল

জুমার দিনের মর্যাদা লাভের জন্য শরিয়তসম্মত বিভিন্ন আমল রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো—

১. দ্রুত মসজিদে যাওয়া

জুমার দিন যত আগে মসজিদে যাওয়া যায়, তত বেশি ফজিলত রয়েছে। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

مَن اغْتَسَلَ يَوْمَ الْجُمُعَةِ غُسْلَ الْجَنَابَةِ ثُمَّ رَاحَ فَكَأَنَّمَا قَرَّبَ بَدَنَةً…

অর্থ: ‘যে ব্যক্তি জুমার দিন গোসল করে প্রথম দিকে মসজিদে যায়, সে যেন একটি উট কোরবানি করল। এরপর যে যায়, সে যেন গরু কোরবানি করল। তারপর যে যায়, সে যেন শিংওয়ালা মেষ কোরবানি করল। এরপর যে যায়, সে যেন মুরগি দান করল। এরপর যে যায়, সে যেন একটি ডিম দান করল। ইমাম যখন বের হন, তখন ফেরেশতারা তাদের লেখার কাজ বন্ধ করে খুতবা শুনতে বসেন।’

(সহিহ বুখারি, ৯২৯)

২. সম্ভব হলে হেঁটে মসজিদে যাওয়া

হজরত আউস ইবনে আউস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

مَنْ غَسَّلَ يَوْمَ الْجُمُعَةِ وَاغْتَسَلَ ثُمَّ بَكَّرَ وَابْتَكَرَ وَمَشَى وَلَمْ يَرْكَبْ…

অর্থ: ‘যে ব্যক্তি জুমার দিন গোসল করে, দ্রুত মসজিদে যায়, হেঁটে যায়, যানবাহনে না ওঠে, ইমামের কাছাকাছি বসে, মনোযোগ দিয়ে খুতবা শোনে এবং অনর্থক কথা বলে না—তার প্রতিটি পদক্ষেপের বিনিময়ে এক বছর রোজা ও রাতের ইবাদতের সওয়াব লেখা হয়।’

(আবু দাউদ, ৩৪৫)

৩. গোসল, মিসওয়াক ও সুগন্ধি ব্যবহার

হজরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

غُسْلُ يَوْمِ الْجُمُعَةِ عَلَى كُلِّ مُحْتَلِمٍ وَسِسَاكٌ وَيَمَسُّ مِنْ الطِّيبِ مَا قَدَرَ عَلَيْهِ

অর্থ: ‘জুমার দিনের গোসল প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্কের জন্য কর্তব্যস্বরূপ; মিসওয়াক করা এবং সামর্থ্য অনুযায়ী সুগন্ধি ব্যবহার করাও উচিত।’

(সহিহ মুসলিম, ৮৪৬)

৪. সূরা কাহফ তিলাওয়াত

জুমার দিনে সূরা কাহফ তিলাওয়াতের ফজিলত সম্পর্কেও হাদিসে বর্ণনা রয়েছে। হজরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত—

مَنْ قَرَأَ سُورَةَ الْكَهْفِ يَوْمَ الْجُمُعَةِ أَضَاءَ لَهُ مِنَ النَّوْرِ مَا بَيْنَ الْجُمُعَتَيْنِ

অর্থ: ‘যে ব্যক্তি জুমার দিন সূরা কাহফ পাঠ করবে, তার জন্য দুই জুমার মধ্যবর্তী সময় নূরে আলোকিত হবে।’

(বাইহাকি, ৫৭৯৩)

৫. বেশি বেশি দরুদ পাঠ

জুমার দিনে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি বেশি বেশি দরুদ ও সালাম পাঠ করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ আমল হিসেবে হাদিসে উৎসাহিত করা হয়েছে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা জুমার দিনে আমার ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ করো; তোমাদের দরুদ আমার কাছে পেশ করা হয়।’

তাই এ দিনে বেশি বেশি দরুদ শরিফ পাঠ করা যেতে পারে।

৬. দোয়া কবুলের বিশেষ সময় অনুসন্ধান

জুমার দিনে এমন একটি বিশেষ সময় রয়েছে, যখন বান্দার দোয়া কবুল হওয়ার সুসংবাদ হাদিসে এসেছে। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

ذَكَرَ يَوْمَ الْجُمُعَةِ فَقَالَ فِيهِ سَاعَةٌ لَا يُوَافِقُهَا عَبْدٌ مُسْلِمٌ وَهُوَ قَائِمٌ يُصَلِّي يَسْأَلُ اللَّهَ شَيْئًا إِلَّا أَعْطَاهُ إِيَّاهُ

অর্থ: ‘জুমার দিনে এমন একটি সময় রয়েছে, কোনো মুসলিম বান্দা ওই সময়ে নামাজরত অবস্থায় আল্লাহর কাছে কিছু চাইলে আল্লাহ তাকে তা দান করেন।’

(সহিহ বুখারি, ৯৩৫)

এ কারণে জুমার দিন বিশেষভাবে দোয়া, জিকির ও ইবাদতে সময় দেওয়া উচিত।

শেষ কথা

জুমার দিন একজন মুমিনের জন্য আত্মশুদ্ধি, ইবাদত, তওবা, দোয়া ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের বিশেষ সুযোগ। পবিত্রতা অর্জন, দ্রুত মসজিদে যাওয়া, খুতবা মনোযোগ দিয়ে শোনা, জুমার নামাজ আদায়, সূরা কাহফ তিলাওয়াত, বেশি বেশি দরুদ পাঠ এবং দোয়া করার মাধ্যমে এ দিনের বরকত অর্জনের চেষ্টা করা উচিত।

আল্লাহ তাআলা আমাদের জুমার দিনের মর্যাদা উপলব্ধি করার এবং কোরআন-সুন্নাহসম্মত আমলের মাধ্যমে এ দিনের ফজিলত অর্জন করার তৌফিক দান করুন। আমিন।

লেখক: ইসলামিক স্কলার, মুফাচ্ছিরে কোরআন ও পীরসাহেব, শাজুলিয়া দরবার শরিফ

Leave A Reply


Math Captcha
32 − 28 =