ছুটে আসেন দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে

মনছুর আলম মুন্না : দেশী-বিদেশী পর্যটকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয় এবং কম্পোর্টেবল সময় হচ্ছে শীতের মাস। তেমনি শীতের সময় উপভোগ করতে এবং পর্যটকরা সমুদ্রের টানে বিমুগ্ধ হয়ে পর্যটন শহরের রাজধানী খ্যাত কক্সবাজার ছুটে আসেন দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে। এদিকে প্রতিবছর শীতকাল আসলেই ভ্রমণ পিপাসুদের মাঝে যে একটি আনন্দ এবং উৎফুল্ল কাজ করে,ঠিক তেমনি পর্যটকদের উপর নির্ভরশীল পর্যটন ব্যবাসায়ীরাও মনের আনন্দে আশা-আকাঙ্ক্ষা নিয়ে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে। বিগত বছরগুলোতে যেভাবে ব্যবসা করে লাভবান হয়েছে, ঠিক এবারও পর্যটকদের টার্গেট করে ব্যবসায়ীরা রীতিমতো লাভবান হওয়ার চিন্তা করছেন। এরই ধারাবাহিকতায় বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকতের শহর এবং পর্যটনের রাজধানী খ্যাত কক্সবাজারেও হোটেল-মোটেল ও সৈকতের আশেপাশে পর্যটন নির্ভরশীল ব্যসায়ীরা তাদের ব্যবসাকে গোছালোর আয়োজনে ব্যস্ত। তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, প্রতি বছরের তুলনায় এবছরে পর্যটকরা কক্সবাজার থেকে শুরু দেশের বিভিন্ন পর্যটন স্পটগুলোতে ভীড় করবেন। যা ধারণক্ষমতার বাইরে হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিলাসবহুল হোটেল -মোটেল ও গেস্ট হাউজগুলোতে পরিপূর্ণ সাপোর্ট আর ব্যবসার সফলতা৷ কক্সবাজার শহরের কলাতলি থেকে শুরু করে মেরিন ড্রাইভ রোড হয়ে ইনানী পাটোয়ারটেকসহ প্রায়ই সাতশোর বেশি হোটেল-মোটেল ও গেস্ট হাউজ রয়েছে। যাদের অধিকাংশই শীতের সময় পর্যটকদের ভরপুর থাকে। প্রতিবছর ন্যায় এবারও পুরোদমে ব্যবসা করার সফলতার স্বপ্ন দেখছেন হোটেল-মোটেল ব্যবসায়ীরা। তবে এবার পর্যটকদের বাড়তি বিনোদন দিতে অধিকাংশ বিলাসবহুল হোটেলগুলোতে নানা আয়োজন করবেন বলে জানা যায় । যাদের মধ্যে রয়েছে লাইভ মিউজিক ডিজে পার্টিসহ দেশীয় গুণী কন্ঠ শিল্পীদের দিয়ে বাড়তি বিনোদন। অন্যদিকে এবারের দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকায় পর্যটকদের বাড়তি চাপ থাকতে পারেও বলে জানান পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। সেক্ষেত্রে আগাম রুম বুকিং দেয়ার বার্তা দেন হোটেল ব্যবসায়ীগুলো। অন্যতায় ভোগান্তিতে পোহাতে হবে। ইতিমধ্যে অনেকেই বুকিং দেয়া শুরু করছেন বিলাসবহুল লাক্সারিয়াস হোটেলগুলো। হোটেল-মোটেল জুন এলাকায় ঘুরে দেখা যায় যায় যে, রঙের কাজ, এবং রুমের ডিজাইন পরিবর্তন করে পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা করে সাজিয়ে রাখার। যা দেখে পর্যটকরা বিমোহিত হয়।
নামীদামী রেস্তোরাঁগুলোতেও পর্যটকদের আকর্ষণ।
কক্সবাজারের সবচেয়ে বেশি পরিচিত রেস্তোরাঁর মধ্যে রয়েছে, শালিক রেস্তোরাঁ, আলগণী, পউষী, জামান, বিরাম, হাড়ি, কাসুন্দি, কয়লা, কুটুমবাড়ি, কাচ্চি ডাইন, রানাঘর, বৈশাখী, ঢাকার বাড়ি, দিল্লী কিচেন, কক্স কার্নিভাল, কাসুন্দিসহ প্রায়ই অর্ধশতাধিক নামী-দামী রেস্তোরাঁতে পর্যটকদের ভিড় দেখা যায়। তবে তারাও স্বল্প মূল্যে রিজেনেবল প্রাইজে এবারের পর্যটকদের টার্গেট করে একটি সফল পর্যটন ব্যবসার সম্ভাবনা দেখছেন। পরিস্থিতি সব ঠিকঠাক থাকলেই এই পর্যটন মৌসুমে হবে ধামাকা পর্যটন ব্যবসা। অন্যান্য ব্যসায়ীদরে মতে তারেও বাড়িত পর্যটন নির্ভর ব্যবসার আশা করছেন।

শুটকিতে পর্যটকদের আকর্ষণ ও ব্যবসায়ীদের চিন্তাধারা।
শহরের বিভিন্ন জায়গায় শুঁটকির অত্যাধুনিক দোকানগুলো এখন পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণীয় ও চাহিদা সম্পুর্ন একটি সুস্বাদু খাদ্য পণ্য। সামুদ্রিক মাছকে শুটকিকে রূপান্তর করে তা বাজারজাত করেন শুটকি মহালের ব্যবসায়ীরা। অধিকাংশ শুটকি শহরের বড়বাজার, বার্মিজ মার্কেট, সুগন্ধা, কলাতলিসহ পর্যটন এরিয়াতে পাওয়া যাচ্ছে। দোকানগুলো দেখতে সাজাসাজ রব। বেশিরভাগ সামুদ্রিক মাছগুলোর মধ্যে দেখা যায়, ছুরি, লইট্রা, লাউক্কা, সুন্দরী, চিংড়ি, ইলিশসহ প্রায়ই চল্লিশ প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ। অধিকাংশ শুটকিগুলো দোকানিরা পৌরসভার এক নাম্বার ওয়ার্ডের নাজিরারটেক এলাকার শুটকি মহাল থেকে সংগ্রহ করে পর্যটকদের আকর্ষণ করতে দোকানে সাজিয়ে রাখছে। এসব দোকান থেকেই পর্যটকরা শুটকি নির্বিঘ্নে সংগ্রহ করে। এবছর শীতে পর্যটনের যে সম্ভাবনা রয়েছে শুটকিতেও এক বিশাল অবদান রাখবেন ব্যবসায়ীরা। পর্যটকদের চাহিদা অনুয়ায়ী শুঁটকি মহাল থেকে শুটকি সংগ্রহ করে তা দেশী-বিদেশী পর্যটকদের বিক্রি করে লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন।

ঐতিহ্যবাহী বার্মিজ মার্কেট!
কক্সবাজার শহরের বাজারঘাটা এলাকায় রয়েছে বেশ কয়েকটি বার্মিজ মার্কেট। যে মার্কেটগুলো একমাত্র পর্যটকদের উপর নির্ভর করে পুরো বছর জুড়েই ব্যবসা করে আসছে। বার্মিজ মার্কেটগুলোর মধ্যে রয়েছে, আবু সেন্টার বার্মিজ মার্কেট, করিম বার্মিজ মার্কেট, সৈকত টাওয়ার বার্মিজ মার্কেট, আশরাফিয়া বার্মিজ মার্কেট, উমে বার্মিজ মার্কেট, বানু প্লাজা বার্মিজ মার্কেট, দুবাই বার্মিজ মার্কেটসহ প্রায়ই ডজনের অধিক। এসব মার্কেটে থেকে পর্যটরা তাদের পছন্দ অনুযায়ী কেনাকাটা করতে যেসব পণ্যের প্রতি আগ্রহ, তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পণ্যগুলো বার্মিজা আঁচার, বেডশিট, লুঙ্গি, থেকে শুরু করে ত্রিপিছ, ফতুয়া, সেন্ডেল জুতা ও বার্মিজ প্রসাধনী সামগ্রী। এবারে দেশের পরিস্থিতি পরিবেশ সব ঠিক থাকায় আকাশচুম্বী ব্যবসার সফলতা দেখছেন বার্মিজ মার্কেটের ব্যবসায়ীরা।

সমুদ্রের ঝিনুক শামুক ও মুক্তার মালার কদর !
কক্সবাজার আসলেই পর্যটকরা অবশ্যই সামুদ্রিক ঝিনুক শামুক ক্রয় করে থাকেন। কেউ তাদর পছন্দের শখের মানুষকে শামুকের গায়ে খুদাই করে নাম লিখে উপহার দেয়ার জন্য নিয়ে যায়, কেউ তাদের বাসাবাড়িতে সাজিয়ে সুপিছ হিসেবে ব্যবহার করতে নিয়ে যান। ঝিনুকের মালা বাসা বাড়ি ও ঘরের সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য স্বল্প দামে কিনে থাকেন। মুক্তারমালাও পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণীয় একটি পণ্য । যেটি নারীরা সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করেন। এসব ঐতহবাহী ঝিনুক শামুক পর্যটকদের মাঝে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয় ।

আমরা কক্সবাজার বাসীর সাধারণ সম্পাদক নাজিম উদ্দীন বলেন, এবার কক্সবাজারবাসী যারা পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী রয়েছেন, তারা যেমন লাভবান হওয়ার আশা দেখছেন তেমনি হতাশারও কমতি নেই। পর্যটকদের বাড়তি বিনোদন দিতে যে একটি তিনমাস ব্যাপী পর্যটন কার্নিভালের আয়োজন করেছে সরকার সেটি একধরনের অন্যান্য বিনোদন থেকে মূখ ফিরিয়ে নেয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন বলে বনে করছি। তবে প্রতিবছরের তুলনায় এবছর অতিরিক্ত পর্যটকদের চাপ বাড়তে পারে।
কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্য সচিব এইচ এম নজরুল ইসলাম বলেন, শীতের মৌসুমে কক্সবাজারের পর্যটনশিল্পের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতি বছর এ মৌসুমে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকরা কক্সবাজারে ছুটে আসেন। এবারের শীতেও পর্যটকদের ব্যাপক সমাগম হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে ডিসেম্বর মাস, বড়দিন, থার্টি ফার্স্ট নাইট ও ইংরেজি নববর্ষকে কেন্দ্র করে পর্যটকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।
তবে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার উপর অনেকাংশ নির্ভর করবে আসন্ন পর্যটন শিল্পের ব্যবসা বানিজ্য।
তিনি আরো বলেন, কক্সবাজারের পর্যটনশিল্পকে এগিয়ে নিতে হলে পর্যটকদের নিরাপত্তা, স্বাচ্ছন্দ্য ও মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করতে হবে। শহরের হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ এবং পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের পর্যটকদের সঙ্গে আন্তরিক ও সৌজন্যপূর্ণ আচরণ করতে হবে। পাশাপাশি হোটেলভাড়া, খাবারের মূল্য এবং অন্যান্য সেবার ক্ষেত্রে যৌক্তিক মূল্য বজায় রাখতে হবে, যাতে পর্যটকরা কোনো ধরনের হয়রানি বা অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের শিকার না হন।
পর্যটকদের আগমন বাড়লে হোটেল-মোটেল ব্যবসায়ী, রেস্তোরাঁ মালিক, পরিবহন খাত, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীসহ পর্যটনসংশ্লিষ্ট সব শ্রেণির মানুষের আয় বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হবে। এর ফলে স্থানীয় অর্থনীতি গতিশীল হবে এবং কর্মসংস্থানের নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে।পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সৈকত পরিচ্ছন্ন রাখা, যানজট নিয়ন্ত্রণ এবং সেবার মান উন্নয়নে প্রশাসন, ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। সবার আন্তরিক প্রচেষ্টা থাকলে এবারের শীতের মৌসুম কক্সবাজারের পর্যটনশিল্পের জন্য সম্ভাবনাময় হয়ে উঠবে এবং পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার সুযোগ পাবেন।
কক্সবাজার হোটেল-মোটেল রেস্তোরাঁ মালিক সামিতির সভাপতি আবুল কাশেম শিকদার বলেন, এবার জমজমাট ব্যবসার প্রহর গুনছি। অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার পর্যটকদের উপর নির্ভর করে পুরোদমে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার জন্য একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করছি। ইতিমধ্যে অনেকেই হোটেল মোটেল কক্ষগুলো আগাম বুকিং দিচ্ছেন। যেহেতু পর্যটক বিশাল একটি অংশ সমাগমের আশা করা যাচ্ছে। তবে কেউ যেন হয়রানি না হয় সে বিষয়টিও বিবেচনায় রাখছি। পর্যটকদের টার্গেট করে কেউ বাড়তি দাম হাকানোর চেষ্টা করলে তাকে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহন করার সিদ্ধান্ত ইতিমধ্যে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেয়া হয়েছে। সবমিলিয়ে এবারের পর্যটন ব্যবসার সফলতা অনেকটা এগিয়ে যাবে।
এদিকে জেলা প্রশাসনের পর্যটন শাখার সহকারী কমিশনার বিজ্ঞ এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মাহমুদুুর রহমান সায়েম বলেন, এবারে পর্যটনের বিশাল এক সম্ভাবনা দেখছেন কক্সবাজারবাসী। কারণ অনেকগুলো সিদ্ধান্ত ইতিমধ্যে গৃহীত হয়েছে। সেন্টমার্টিনে রাত্রি যাপনের বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে যে একটি সিদ্ধান্ত আসতে পারে,পর্যটকরা নির্বিঘ্নে সেন্টমার্টিন যাওয়ার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় থেকে অতিশিগ্রই আসবে। এছাড়াও নিরাপত্তা নিশ্চিত। অবৈধ ঝুপড়ি, হোটেল-মোটেলে হয়রানী রোধ করতে জেলা প্রশাসন নিয়মিত কাজ করবে। সবমিলিয়ে একবারের পর্যটনের বিশাল এক সম্ভাবনা দেখছেন পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।
