আলী প্রয়াস
বই মানবসভ্যতার জ্ঞানসংগ্রহের এক অনন্য ভাণ্ডার। একটি জাতির চিন্তা, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ভবিষ্যৎ গঠনে এটি মৌলিক ভূমিকা পালন করে। মানুষের চিন্তাশক্তিকে বিকশিত করা, যুক্তিকে দৃঢ় করা এবং মূল্যবোধকে পরিশীলিত করার ক্ষেত্রে বইয়ের অবদান অপরিসীম। এই বইকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে এক প্রাণবন্ত সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল, যার সবচেয়ে উজ্জ্বল প্রকাশ বইমেলা। বইমেলা ধারণা বিনিময়, সৃজনশীলতার বিকাশ এবং জ্ঞানচর্চার বিস্তারের একটি কার্যকর ক্ষেত্র।
একটি মননশীল সমাজ প্রতিষ্ঠায় লেখক, প্রকাশক ও পাঠকের পারস্পরিক সম্পর্ক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। লেখক তার চিন্তা ও সৃষ্টির মাধ্যমে সমাজে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি যোগ করেন, প্রকাশক সেই সৃষ্টিকে সুশৃঙ্খলভাবে পাঠকের কাছে পৌঁছে দেন, আর পাঠক তা গ্রহণ করে বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করেন। এই পারস্পরিক সহযোগিতা একটি শক্তিশালী সাংস্কৃতিক ভিত্তি তৈরি করে। অতীত অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, বইমেলা সামাজিক পরিবর্তন, সাংস্কৃতিক জাগরণ এবং একটি জাতির আত্মপরিচয় নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে।
চট্টগ্রামের বইমেলা ইতোমধ্যেই একটি উল্লেখযোগ্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। গত কয়েক বছরে এটি কেবল আঞ্চলিক পরিসরে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বইমেলা হিসেবে নিজস্ব মর্যাদা অর্জন করেছে। আগামী ৩১ মার্চ থেকে শুরু হতে যাওয়া ‘স্বাধীনতা বইমেলা ২০২৬’ সেই ধারাবাহিকতারই একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত চলমান এই আয়োজন স্টেডিয়াম সংলগ্ন জিমনেশিয়াম মাঠে অনুষ্ঠিত হবে, যা নিঃসন্দেহে একটি বৃহৎ সাংস্কৃতিক মিলনমেলায় রূপ নেবে।
এবারের বইমেলার প্রেক্ষাপট কিছুটা ভিন্ন। রমজান মাস এবং নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতির কারণে জাতীয় পর্যায়ের অমর একুশে বইমেলা যথাসময়ে না হওয়াতে সফল হয়নি। এই বাস্তবতা বিবেচনায় এনে চট্টগ্রামে ‘একুশে বইমেলা’র পরিবর্তে ‘স্বাধীনতা বইমেলা’ আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা নিঃসন্দেহে একটি সময়োপযোগী ও দূরদর্শী পদক্ষেপ।
২০১৯ সাল থেকে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে এবং চট্টগ্রাম সৃজনশীল প্রকাশক পরিষদের ব্যবস্থাপনায় এই মেলা নিয়মিতভাবে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এই ধারাবাহিক আয়োজনের ফলে বইমেলাটি একটি সুসংগঠিত ও প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে। লেখক, পাঠক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, সাংস্কৃতিক কর্মী ও বিভিন্ন পেশার মানুষের অংশগ্রহণে এটি এখন একটি বহুমাত্রিক মিলনমেলায় রূপ নিয়েছে। স্থানীয় লেখক-প্রকাশকদের পাশাপাশি জাতীয় পর্যায়ের খ্যাতিমান প্রকাশক ও সাহিত্যিকদের অংশগ্রহণ মেলাটিকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এই বইমেলার মূল চালিকাশক্তি হিসেবে যে ভূমিকা পালন করছে, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। এটি তাদের জন্য একটি বার্ষিক সর্ববৃহৎ আনুষ্ঠানিক আয়োজন। নগরের সাংস্কৃতিক বিকাশ, জ্ঞানচর্চার প্রসার এবং নাগরিক জীবনের মানোন্নয়নের একটি ধারাবাহিক উদ্যোগ। বইমেলাকে তারা একটি সমন্বিত সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করেছে। একটি আধুনিক ও মননশীল নগর গঠনের লক্ষ্যের সঙ্গে এই উদ্যোগ গভীরভাবে সম্পৃক্ত।
মেয়রের নেতৃত্বে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এই মেলাকে একটি সুপরিকল্পিত ও বর্ণাঢ্য আয়োজনে রূপ দিতে কাজ করে যাচ্ছে। পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, স্টল বিন্যাস, বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিতকরণ—সবকিছুতেই তাদের সক্রিয় ও দায়িত্বশীল ভূমিকা লক্ষ্য করা যায়। দর্শনার্থীদের জন্য একটি নিরাপদ, আরামদায়ক ও আকর্ষণীয় পরিবেশ নিশ্চিত করার মাধ্যমে তারা মেলাকে পরিবারবান্ধব ও সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য উন্মুক্ত করে তুলেছে।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো সিটি কর্পোরেশনের শিক্ষা ও সমাজকল্যাণ বিভাগগুলোর তৎপরতা। তারা শুধু আয়োজনের প্রশাসনিক দিকেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং শিক্ষার্থী, তরুণ প্রজন্ম ও সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে বইপড়ার অভ্যাস গড়ে তোলার জন্য নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করছে। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও জ্ঞানভিত্তিক কার্যক্রম পরিচালনা—এসবই তাদের সুদূরপ্রসারী চিন্তার বহিঃপ্রকাশ।
এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নগরের মানুষের প্রতি তাদের দায়িত্ববোধের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। বইমেলার মতো একটি প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে তারা কেবল সাংস্কৃতিক চর্চাকেই উৎসাহিত করার পাশাপাশি একটি সচেতন ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের পথও সুগম করছে। এ ধরনের উদ্যোগই একটি জাতিকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
অপর দিকে চট্টগ্রাম সৃজনশীল প্রকাশক পরিষদ এই বইমেলার প্রাণকেন্দ্র হিসেবে যে দায়িত্ব পালন করে আসছে, তা মেলার সাফল্যের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। তাদের পরিকল্পনা, সমন্বয় ও নিরলস কর্মতৎপরতার ফলে মেলাটি একটি সুশৃঙ্খল, নান্দনিক ও অংশগ্রহণমূলক সাংস্কৃতিক আয়োজন হিসেবে গড়ে উঠেছে। কেবল প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনেই সীমাবদ্ধ না থেকে পরিষদ মেলার সামগ্রিক মানোন্নয়নে একটি সৃজনশীল নেতৃত্ব প্রদান করছে।
স্টল ব্যবস্থাপনায় তাদের দক্ষতা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রকাশকদের জন্য সুবিন্যস্ত স্টল বরাদ্দ, নান্দনিক ডিজাইন, পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা—এসবই মেলাকে দর্শনার্থীদের জন্য আকর্ষণীয় করে তোলে। একই সঙ্গে দেশব্যাপী প্রকাশকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করে মানসম্মত ও বৈচিত্র্যময় বই মেলায় আনার ক্ষেত্রে পরিষদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। নতুন প্রকাশনা, গবেষণাধর্মী বই, সৃজনশীল সাহিত্য—সবকিছুর একটি ভারসাম্যপূর্ণ উপস্থিতি নিশ্চিত করার মাধ্যমে তারা মেলার মান ধরে রাখছে।
মেলার সৌন্দর্য ও পরিবেশ নির্মাণেও পরিষদের সচেতন দৃষ্টি রয়েছে। প্রবেশপথ থেকে শুরু করে অভ্যন্তরীণ বিন্যাস, আলোকসজ্জা, সাংস্কৃতিক মঞ্চ—সবকিছুতেই একটি শিল্পিত ও দর্শকবান্ধব পরিকল্পনার দৃশ্য দেখা যায়। এর ফলে বইমেলা বাণিজ্যিক আয়োজন না থেকে একটি পূর্ণাঙ্গ সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়।
পাঠক আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রেও পরিষদের উদ্যোগ প্রশংসনীয়। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আলোচনা, লেখক-পাঠক লেখক আড্ডা এবং প্রচারণামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে তারা মেলাকে প্রাণবন্ত করে তোলে। একই সঙ্গে প্রকাশকদের মধ্যে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি বজায় রাখা, পারস্পরিক সহযোগিতার পরিবেশ তৈরি করা এবং যেকোনো সমস্যার দ্রুত সমাধান নিশ্চিত করাও তাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের অংশ।
বলা যায়, চট্টগ্রাম সৃজনশীল প্রকাশক পরিষদ এই বইমেলার সার্বিক ব্যবস্থাপনায় একটি শক্তিশালী ও নির্ভরযোগ্য ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। পরিষদের আন্তরিকতা, অভিজ্ঞতা ও দূরদর্শিতাই মেলাটিকে দিন দিন আরও সমৃদ্ধ ও সফল করে তুলছে।
লেখকদের জন্য বইমেলা একটি বিশেষ সুযোগের জায়গা। এখানে তারা পাঠকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করতে পারেন, তাদের প্রতিক্রিয়া জানতে পারেন এবং নতুন সৃষ্টির অনুপ্রেরণা পান। বিশেষ করে নতুন ও তরুণ লেখকদের জন্য এটি আত্মপ্রকাশের একটি কার্যকর মাধ্যম।
পাঠকদের কাছে বইমেলা এক ধরনের উৎসব। এখানে তারা নতুন বইয়ের সঙ্গে পরিচিত হন, প্রিয় লেখকদের কাছাকাছি আসার সুযোগ পান এবং নানা ধরনের বই সংগ্রহ করতে পারেন। বর্তমান ডিজিটাল যুগে পাঠাভ্যাস কিছুটা পরিবর্তিত হলেও বইমেলা সেই আগ্রহকে পুনরুজ্জীবিত করতে সক্ষম।
অন্যদিকে প্রকাশকদের জন্য এই মেলা ব্যবসায়িক ও সৃজনশীল উভয় দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। নতুন বই প্রকাশ, পাঠকের চাহিদা অনুধাবন এবং বাজার সম্প্রসারণ—সবকিছুই এই মেলার মাধ্যমে সম্ভব হয়। চট্টগ্রাম সৃজনশীল প্রকাশক পরিষদের দক্ষ ব্যবস্থাপনা এই প্রক্রিয়াকে আরও সুসংহত করেছে।
মেলার সাফল্য নির্ভর করে এর অংশগ্রহণমূলক চরিত্রের ওপর। এবারের মেলার একটি বিশেষ দিক হলো বাংলা নববর্ষের অন্তর্ভুক্তি। ১৪ এপ্রিল নববর্ষ উদযাপনের ফলে মেলায় বাড়তি উৎসবের আমেজ তৈরি হবে। বিশেষ আয়োজন ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান মেলাকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলবে। প্রতিদিনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আলোচনাসভা ও সেমিনার মেলার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রবীন্দ্র-নজরুল, লোকসংগীত, আদিবাসী সংস্কৃতিসহ বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক আয়োজন মেলার সাংস্কৃতিক পরিসরকে সমৃদ্ধ করে।
তবে মেলা ফেব্রুয়ারিতে না হওয়ায় কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। নির্ধারিত সময়ের পরিবর্তন, আবহাওয়া এবং দর্শনার্থীর উপস্থিতি—এসব বিষয় আয়োজকদের বিবেচনায় রাখতে হবে। অনলাইন প্রচারণা বৃদ্ধি, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সক্রিয়তা, বিশেষ অফার এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব।
পরিশেষে আমরা মনে করি চট্টগ্রামের বইমেলা সাংস্কৃতিক আন্দোলনের একটি অংশ ও সামাজিক দায়বদ্ধতা। আমরা বিশ্বাস করি, সঠিক পরিকল্পনা, পাঠকের আন্তরিকতা এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই মেলা সফল হবে এবং চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে আরও সমৃদ্ধ করবে।
কবি, প্রকাশক, সংগঠক। সাবেক সাধারণ সম্পাদক, চট্টগ্রাম সৃজনশীণ প্রকাশক পরিষদ।

