Saturday, April 18

জ্যোতির্ময় নন্দী

অমলতাস কথাটা বললেই মনে একটা নির্মল মেঘমালিন্যমুক্ত নীলাকাশের কথা, অবাধ মুক্তির কথা মনে পড়ে। — অমল ধবল পালে লেগেছে মন্দমধুর হাওয়া…”। শব্দটার মধ্যেই রয়েছে ‘অমল’ আর ‘অমলতা’ — মলিনতাহীন আর মালীন্যহীনতা। আর শব্দটার শেষের ‘তাস’ অংশটা (জয় জয় তাসবংশ-অবতংশ/ক্রীড়াসরসীনীড়ে রাজহংস”) মনে আনে অবসরক্রীড়ার নির্মল আনন্দময় সময় যাপনের আভাস:
“চিড়িতন হরতন ইস্কাপন অতি সনাতন ছন্দে করতেছে নর্তন…”
‘অমলতাস’ আসলে একটা ফুলের নাম, যেটাকে আমরা, পূর্ববঙ্গের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ স্বর্ণালু (চাটগেঁয়েরা বলে ‘হন্নালু’) বা সোনালু নামেই বেশি চিনি। এ ফুলের আরো একটা নাম আছে, যেটা বলবো এ লেখার একেবারে শেষে গিয়ে।
অমলতাস বা সোনালুর সৌন্দর্যের তুলনা নেই। বসন্তে পলাশ, শিমুল, মাদার, অশোক, কৃষ্ণচূড়া, পারিজাতের একচেটিয়া রক্তিম আধিপত্যের মাঝখানে সোনালুর সোনালি হলুদ আর জারুলের ঘনবেগুনি রঙের বিদ্রোহ কার না নয়ন-মন ভুলিয়েছে! আর সোনালু যখন ফুলে ফুলে তার পাতার সবুজকে পর্যন্ত ঢেকে দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে একা, সোনার ফুলের একটা বিশাল স্তবকের মতো, তখন তার চারপাশে জেগে ওঠে যেন এক স্বর্ণাভ জ্যোতির্বলয়।
অমলতাস নিয়ে এত কথা বললাম, কারণ আসলে এ নামেরই একটা সাহিত্য সাময়িকী নিয়ে এখানে একটু কথাবার্তা বলার ইচ্ছা রাখি। ষাণ¥াষিক সাময়িকীটার এই অপূর্ব কাব্যিক ভাবব্যঞ্জক নামটা নিশ্চয় রেখেছেন তার সম্পাদক-প্রকাশক সাবিনা পারভীন লীনা, যাঁকে আমরা কবি-গল্পকার সাবিনা লীন নামেই বেশি চিনি। তাঁর কবিতা আমরা যতটুকু পড়েছি বা জেনেছি, তাঁর কাব্যচিন্তা বা চেতনার সাথে তাঁর সাময়িকীর এই ‘অমলতাস’ নামটি সম্পূর্ণ সঙ্গতিপূর্ণ মনে হয়েছে। তাঁর জীবনে ও কাব্যে প্রকৃতিলগ্নতা এবং সুন্দরের পূজারী হৃদয়ের পরিচয় পাওয়া যায় এই সাময়িকীটির ‘অমলতাস’ নামটির মধ্যে দিয়ে।
এবার কয়েকটা কথা বলা যাক সাময়িকীটির মান আর পরিমাণ নিয়ে। বাহুল্যবোধে নামতালিকা না দিয়েই বলি, বাংলা ভাষায় যথার্থ উচ্চমানের সাহিত্য সাময়িকীর বা ছোট কাগজের অভাব নেই, কোনোকালেই ছিল না। আবার সম্পূর্ণ মানহীন, গণ্য করারও অযোগ্য নগণ্য কাগজের সংখ্যাও অজস্র। প্রকৃতপক্ষে, শেষোক্তরা বিপুল সংখ্যাগুরু। সেক্ষেত্রে, প্রথমোক্তরাই সংখ্যগুণে বা সংখ্যাবৈগুণ্যে নগণ্য। মান-পরিমাণের বিচারে, মাত্র ৯৬ পৃষ্ঠার অমলতাসকে আকার ও আয়তনে লঘু বলা গেলেও, লেখক ও বিষয়সূচির বৈচিত্র্যে, অভিনবত্বে এবং সাহসিকতায় গুরুদের দলেই ফেলতে হবে।
এবার তোলা যেতে পারে আরেকটা প্রশ্ন: এত এত ছোট কাগজের ভিড়ে আবার একটা নতুন কাগজ কেন? তা ছাড়া, আমাদের বর্তমান দেশ-কালে যে পরিবেশ-পরিস্থিতি বিরাজ করছে, সেটা যে লিবারেল সাহিত্যচর্চার একান্ত প্রতিকূল, সে কথা স্বীকার করতেই হবে। এ মুহূর্তে এমন একটা কাগজ বের না করলেই কি চলছিল না? এটা কি অনেকটা রোম যখন পুড়ছে তখন সম্রাট নিরোর বসে বওস বাঁশি বাজানোর মতো নিষ্ঠুর নির্বিকার আচরণ নয়? এসব জিজ্ঞাসার চমৎকার জবাব দিয়েছেন সাময়িকীটির সম্পাদক নিজেই, পত্রিকার শুরুতে তাঁর দেয়া সংক্ষিপ্ত অথচ সুলিখিত প্রবন্ধটায়, এভাবে:
যদিও একথা সত্যি, এই সময়ে যেখানে মানুষ জীবন আর জগৎ সংসারের বাইরে এক মুহূর্ত ভাবার অবকাশ পায় না, সেখানে এই ধরনের একটি সাহিত্যপত্র, যা শুধুমাত্র কবিতাকেন্দ্রিক, তা নিয়ে আমরা কেনই-বা মেতে উঠলাম। এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়। তবে অনুভব করা যায়, অনুভব করা সম্ভব। এ সম্ভাবনার তর্ক চলতে পারে।
সংকটে, সন্তাপে, অস্থিরতায় কবিতা নিয়ে একটু নিরিবিলি জায়গা তৈরি করার প্রত্যাশায় জন্ম নিয়েছে অমলতাস। আমরা বিশ্বাস করি, কবিতা কখনো পুরনো হয় না। তার ভাষা বদলায়, কিন্তু স্পন্দন একই থাকে। আজকের অচেনা এবং অদ্ভুত এই সময়ে কবিতা আমাদের নিঃশ্বাসও বটে। অমলতাস চায় এই নিঃশ্বাসটুকু টিকিয়ে রাখতে, যেখানে তরুণ ও প্রাজ্ঞ লেখক প্রাচীন ও নবীন প্রদীপ হাতে নিয়ে একসঙ্গে খুঁজবেন নতুন পথ, নতুন অনুষঙ্গ। আমাদের চিন্তা, প্রেম, প্রতিবাদ ও সৌন্দর্য এখানে পাশাপাশি থাকবে — এই দুঃসময়ে।
সম্পাদকীয়ের শেষভাগে আশাবাদী হয়েছেন সম্পাদক, বর্তমান দুষ্কালের দিবানিশি থেকে উত্তরণে সহায়ক হবে এ সাময়িকী:
সময়ের প্রবাহে পরিবর্তিত জীবনের নানা রূপ শিল্পে একীভূত হবে এখানে। ভাবনা, দর্শন ও অনুভূতির ঐক্যও সৃষ্টি হতে পারে। আশা করছি, এর মাধ্যমে আপনাদের গভীরতম উপলব্ধিগুলো হবে আমাদের জন্য উৎকর্ষতম পাথেয়।
সম্পাদকীয়ের পর আরো পাঁচটি বিভাগে বিভক্ত করে ছাপানো হয়েছে সাহিত্যপত্রটিতে অন্তর্ভুক্ত লেখাগুলো। বিভাগগুলোর শিরোনাম হল: কবিতালাপ, মনোকণিকা, অন্যমাটির স্বর, স্মৃতির খাম, এবং জীবনচরিত।
সাময়িকীটি ঘোষিতভাবে একটি “কবিতাকেন্দ্রিক সাহিত্যপত্র”, আর তাই স্বাভাবিকভাবেই কবিতাকে ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে এ কাগজে প্রকাশিত যাবতীয় লেখা। এর মধ্যে কবিতালাপ বিভাগটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটাই এ কাগজের বৃহত্তম বিভাগ, যার মধ্যে মুদ্রিত হয়েছে প্রবীণ ও নবীন দশজন কাব্যবোদ্ধার দশটি মনোজ্ঞ ও গুরুত্বপূর্ণ নিবন্ধ। কবি ও কবিতার ইতিহাস, কাব্য অনুধাবন, কবিতার ছন্দ-উপমা-অলঙ্কারাদি বিশ্লেষণ, বিশিষ্ট কবিদের জীবন ও কাব্য নিয়ে আালোচনা প্রভৃতি বিভিন্নমুখী বিষয় রয়েছে এ সূচিতে। কবিতালাপ-এর নিম্নোদ্ধৃত লেখাগুলোর শিরোনাম (লেখকের নামসহ) থেকে সেগুলোর বিষয়বস্তু সম্পর্কে আভাস পাওয়া যাবে:
* কবিতার স্বর শুনি আমার কাব্যকামে : সেলিনা শেলী
* সমকালে লুপ্ত সনেট গ্রন্থ ‘কঙ্কণের হেঁয়ালি কীর্তন’ : শাহিদ হাসান
* কবিতা বলতে আমি যা বুঝি: সৈকত দে
* কাজি নজরুল ইসলামের ‘কারার ওই লৌহ কপাট’ : ধ্বনি, ছন্দ ও বিদ্রোহের সক্রিয় দলিল: শোয়েব নাঈম
* ‘সঞ্চয়িতা’র কবি : লুসিফার লায়লা
* পল্লিকবির সবুজ আঙিনা ছুঁয়ে : সালেহ বিপ্লব
* অভ্যন্তরের দরজায় কড়া নাড়ে কিছু : দীপংকর দস্তিদার

* কবিতা যখন শেষ আশ্রয় : গুয়াতানামো কারাগারে বন্দি জীবনের মর্মস্পর্শী দলিল: হামিদ উদ্দিন
কবিতার জাগতিক ও মহাজাগতিক সমস্ত দিক ছুঁয়ে যাওয়া হয়েছে এই লেখাগালোতে।
অমলতাস উদ্বোধনী সংখ্যার দ্বিতীয় বিভাগ মনোকণিকায় রয়েছে বারোজন জ্যেষ্ঠ-কনিষ্ঠ কবির কবিতা। ক্রমানুসারে গ্রন্থিত কবিরা হলেন: হাফিজ রশিদ খান, মহীবুল আজিজ, এজাজ ইউসুফী, রিজোয়ান মাহমুদ, জিন্নাহ চৌধুরী, শামিম নওরোজ, সাজিদুল হক, হাবিব আহসান, অনুপমা অপরাজিতা, রেদওয়ান খান, রওশন রুবী, এবং ঋতিল মণীষা।
অন্যমাটির স্বর বিভাগে মুদ্রিত হয়েছে একটিমাত্র নিবন্ধ ‘মণিপুরী কবি শরৎচন্দ্র থিয়ামের কবিতা’ শিরোনামে। লেখক জ্যোতির্ময় নন্দী। এ নিবন্ধে থিয়ামের জীবন ও কর্মের পরিচয় তুলে ধরা ছাড়াও তাঁর বেশ কিছু কবিতা অনুবাদ করে দিয়েছেন লেখক নিজেই।
পরবর্তী বিভাগ স্মৃতির খাম-এ রয়েছে বিংশ শতকের বাংলা কবিতার জন্যে গুরুত্বপূর্ণ একটা ঐতিহাসিক ও স্মরণযোগ্য চিঠির পুনর্মুদ্রণ। চিঠিটা লিখেছেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, মলয় রায় চৌধুরীকে। বাংলা কবিতা আর উপন্যাসের পাঠকদেরকে সুনীলের পরিচয় দেয়ার প্রয়োজন খুব একটা আছে বলে মনে হয় না। উনি তো প্রবলভাবে স্বনামধন্য!
তবে কবিতার আমপাঠকদের কাছে অপরিচিত বা অত্যল্পপরিচিত মলয়বাবুর পরিচয়টা সংক্ষেপে একটু তুলে ধরা উচিত। মলয় রায়চৌধুরী (২৯ অক্টোবর, ১৯৩৯ – ২৬ অক্টোবর, ২০২৩ ) একজন বাঙালি কবি, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক , সাংবাদিক, গণবুদ্ধিজীবী এবং সর্বোপরি ১৯৬০-এর দশকের হাংরি আন্দোলন তথা হাংরিয়ালিজম তথা বাংলা সাহিত্যে প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার জনক এবং এ কারণে তিনি ১৯৬০-এর দশক থেকেই ব্যাপক পাঠকগোষ্ঠীর দৃষ্টি আর্কষণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। আধুনিক বাংলা কবিতার ইতিহাসে তিনি বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব। গতানুগতিক চিন্তাধারা সচেতনভাবে বর্জনের মধ্য দিয়ে তিনি বাংলা সাহিত্যে উত্তর-আধুনিকতাবাদ চর্চা এবং প্রতিষ্ঠানবিরোধী আন্দোলন শুরু করেন। নিজের লেখা ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ শীর্ষক কবিতাটির জন্যে ১৯৬৪-তে তিনি রাষ্ট্রবিরোধী মামলায় গ্রেফতার হন ও কারাবরণ করেন।
চিঠিটা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় মলয় রায়চৌধুরীকে লিখেছিলেন ১৯৬৪-তে আমেরিকার আইওয়া থেকে, যখন মলয় নামক মত্তহস্তীর প্রচণ্ড পদচারণায় কলকাতার কাব্য-সাহিত্যের কমলবন পর্যুদস্ত। সুনীল নিজে তখন যুক্তরাষ্ট্রের আইওয়ায়। ষাটের দশকের গোড়ার দিকে আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান মি. পলেন কলকাতায় এলে সুনীলের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ পরিচয় হয়। সেইসূত্রে তিনিই সুনীলকে আমেরিকায় নিয়ে যান ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসাবে। ওখান থেকে পাস করার পর ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপগ্রন্থাগারিক হিসেবেও কিছুদিন কাজ করেন সুনীল।
চিঠিতে সুনীল স্পষ্টত তাঁর ব্যক্তিগত অসমর্থন ও অসন্তোষ জানিয়েছেন মলয় ও তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গোদের এহেন আচরণ এবং তথাকথিত আন্দোলনের ব্যাপারে। আসলে এসব তৎপরতার ব্যাপারে গর্ব করে তাঁকে মলয়ের লেখা একটা চিঠির জবাবে এ চিঠি লিখেছিলেন তিনি। চিঠিটায় তিনি বলেছেন:
কিছু লেখার বদলে আন্দোলন ও হাঙ্গামা করার দিকেই তোমার লক্ষ্য বেশি।…….. আমার ওতে কোনো মাথাব্যথা নেই। যত খুশি আন্দোলন করে যেতে পারো — বাংলা কবিতার ওতে কিছু আসে যায় না। মনে হয় খুব একটা শর্টকাট খ্যাতি পাবার লোভ তোমার।……… তোমাকে ভয় করতুম, যদি তোমার মধ্যে এখনও পর্যন্ত একটু জেল্লা দেখতে পেতুম।
কাব্য-সাহিত্য নিয়ে আন্দোলন-হাঙ্গামার বদলে সৃজনের গোলা ফলে-ফসলে পরিপূর্ণ করে তোলার দিকেই সুনীলের ঝোঁক ছিল, আর এক্ষেত্রে তাঁর বিশাল পরঙ্গসমতার কথা বাংলা কাব্য-সাহিত্যের পাঠকূলের অজানা নেই। তাঁর কথা হল, ওসব অন্দোলন-টান্দোলন না করে লিখতে হবে। শুধু লিখলেই হবে না, ভালো লিখতে হবে, যার মধ্যে “জেল্লা” আছে। চিঠিতে পরিষ্কার ভাষায় বলে দিয়েছেন:
আমার কথা হলো, যে যে বন্ধু আছো, কাছে এসো। যে ভালো কবিতা লেখো কাছে এসো– যে যে বন্ধু নও, বাজে কবিতা লেখো, দূর হয়ে যাও কাছ থেকে।
জেনারেশনওয়ালাদের প্রতি ক্রুদ্ধ ভর্ৎসনার সুরে সুনীল বলেছেন:
চালিয়ে যাও ওসব আন্দোলন কিংবা জেনারেশনের ভণ্ডামি। ……… সাহিত্যের মৌরসি পাট্টা বসাতে এক এক দলের অত লোভ কী করে আসে, কী জানি।
মনে হয়, সুনীলকে পাঠানো চিঠিটায় মলয় তাঁর স্বভাবোচিতভাবে তাঁকে হুমকি-ধমকি দিয়ে কিছু লিখেছিলেন হয়তো। সম্ভবত তারই জবাবে সুনীল চটেমটে লিখেছেন:
তবে একটা কথা জানিয়ে রাখা ভালো। আমাকে দেখেছ নিশ্চয়, শান্তশিষ্ট, ভালো মানুষ। আমি তাই-ই, যদিও গায়ে পদ্মাপাড়ের রক্ত আছে। সুতরাং তোমাদের উচিত আমাকে দূরে-দূরে রাখা, বেশি খোঁচাখুঁচি না করা। নইলে, হঠাৎ উত্তেজিত হলে কী করব বলা যায় না। ……… দু-একজন বন্ধুবান্ধব ও-দলে আছে বলে নিতান্ত স্নেহবশতই তোমাদের হাংরি জেনারেশন গোড়ার দিকে ভেঙে দিইনি। এখনও সে ক্ষমতা রাখি, জেনে রেখো। তবে এখন ইচ্ছে নেই ও খেলাঘর ভাঙার।
একটি বড় এবং তিনটি মাঝারি মাপের অনুচ্ছেদের সমষ্টি (যার অনেকটাই আমি এখানে উদ্ধৃত করেছি) অনতিবৃহৎ একটি চিঠির পুনর্মুদ্রণ নিয়ে আমি এত বাক্যব্যয় করছি কেন? কারণ আমার মনে হয়েছে, গত শতকের পঞ্চাশের দশকের পশ্চিমের বিট জেনারেশন বা অ্যাংরি ইয়াং মেন আন্দোলনের প্রভাবে যেমন ষাটের দশকের কলকাতায় শুরু হয়েছিল হাংরি আন্দোলন, একইভাবে সত্তরের দশকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা অর্জনের পর শুরু হয়েছিল চট্টগ্রামে অনুরূপ আরেকটি ক্রুদ্ধ জেনারেশন আন্দোলন, নানা কথা ভেবে যার নামোচ্চারণ থেকে বিরত রইলাম। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্বদাতা রাজনৈতিক দলটি থেকে স্বাধীনতার পরপরই বেরিয়ে চলে আসা কয়েকজন দ্রোহী তরুণ তথাকথিত এক বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের ধ্বজাধারী যে অর্বাচীন রাজনৈতিক দলটির পত্তন করল, মূলত তারই সদস্য ও অনুসারী কিছু তরুণ যুবক চট্টগ্রামে সূত্রপাত ঘটাল এই ‘জেনারেশন’ আন্দোলনের। বিট জেনারেশন বা হাংরি জেনারেশনের মতো এরাও সমাজ ও সাহিত্যের প্রচলিত শৃঙ্খল ভেঙে নতুন পথের আহ্বান জানিয়েছিল। তাদের সাহিত্যে ছিল প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের সুর, আর সেইসঙ্গে বিভ্রান্তির আলেয়া, যাকে অনেকে সত্যিকারের আগুন বলে ভুল ধারণা করেছে।
পশ্চিমা সমাজব্যবস্থা থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে জন্ম নেয়া বিট আন্দোলনের হাল ধরেছিলেন জ্যাক কেরুয়াক, অ্যালেন গিন্সবার্গ, নর্ম্যান মেইলারের মতো দিকপাল কবি-সাহিত্যিকেরা। তাঁদের কলমে জন্ম নিয়েছিল কাব্যে অভিনব সব রূপকল্প। নারী আন্দোলন ও হিপি প্রতিসংস্কৃতির ভুবনে তাঁরা রেখে গেছেন তাঁদের অমোঘ ছাপ। আর অ্যাংরি ইয়াং মেন নামে পরিচিত প্রথিতযশা ও জনপ্রিয় ব্রিটিশ নাট্যকার ও ঔপন্যাসিকরা, যাঁদের মধ্যে ছিলেন জন অসবর্ন, কিংসলে অ্যামিস, জন ব্রেইন, অ্যালান সিলিটো, জন ওয়েইন প্রমুখ, তাঁদের রচনায় প্রতিধ্বনিত হয়েছে প্রচলিত সমাজব্যবস্থার প্রতি গভীর অসন্তোষ, এক অশান্ত যুগের আর্তনাদ।
তবে কিনা, অন্তঃসারশূন্য অনুকরণ যে তেমন কোনো সুফল বয়ে আনতে পারে না, কলকাতা ও চট্টগ্রামের জেনারেশন-ভিত্তিক বা নামধারী সাহিত্য আন্দোলনগুলো তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। এসব আন্দোলনে সাহিত্যগত সৃজন বা সুকৃতি নিতান্ত সীমিত বা অনুল্লেখ্য। বৃহত্তর পাঠক সমাজও তাদেরকে মনে রাখে নি। বাংলা সাহিত্যে বা সমাজে তাঁরা কোনো অনপনেয় ছাপ রাখতে পেরেছেন বলেও মনে হয় না। তাঁদের রাজনীতি বা সাহিত্য-নীতি অনুসরণ ও তজ্জনিত বিকারগ্রস্ততায় কিছু নির্বোধ তরুণ আক্রান্ত হয়ে বিপথগামী হয়েছে, গোল্লায় গেছে– এইমাত্র। প্রতিষ্ঠান ও প্রাতিষ্ঠানিকতা-বিরোধী এ আন্দোলনের নেতারা আর হোতারা এখন অনেকে নিজেরাই প্রতিষ্ঠান বা প্রতিষ্ঠানের পদলেহী, উচ্ছিষ্টভোজী।
রাগী বা দ্রোহী প্রজন্ম হিসেবে চিহ্নিত এসব জেনারেশন আন্দোলনের পথ ধরেই এসেছে আজকের জেনারেশান-জি বা জেন-জি। যেসব কুৎসিত গালিগালাজ, অশ্লীল বা অশালীন স্লোগান ইত্যাদির প্রাথমিক পরিচয় আমরা পেয়েছিলাম পূর্বকথিত জেনারেশান অন্দোলনগুলোর পুস্তিকায়, লিফলেটে, ইশতেহারে, তারই ষোলকলায় পরিপূর্ণ রূপ জেন-জিরা দেখিয়েছে রাজপথে। ঐতিহ্যকে অস্বীকার, প্রবীণদের অবমাননা, বিধ্বংসী মনোভাব প্রভৃতি যেসব লক্ষণ পূর্বসুরী জেনারেশানগুলোতে দেখা গেছে আভাস হিসেবে, আর জেন-জি তার প্রকাশ ঘটিয়েছে কংক্রিট বাস্তব রূপে। তবে পূর্বসুরীদের মতো তারাও শেষপর্যন্ত অশ্বডিম্ব প্রসব করেছে, যেহেতু অনুকরণ করে আর হুজুগে মেতে কোনো মহৎ উদ্দেশ্য সাধিত হয় না, সাময়িক কিছু আলোড়ন সৃষ্টি আর ব্যক্তিগত কিছু স্বার্থসিদ্ধি করা যায় মাত্র।
একারণেই, পূর্বোক্ত চিঠিতে মলয় রায়চৌধুরীকে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ভর্ৎসনা আমি যথোপযুক্ত মনে করি। সুনীল এখানে কিছু কঠিন সত্য উচ্চারণ করেছেন, যা যুগে যুগে, কালে কালে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে সাহিত্যসেবীদের স্মরণে রাখা উচিত। সম্ভবত ভুলবশতই চিঠিটার শিরোনাম কাগজটির সূচিপত্রে রাখা হয় নি।
অমলতাসের সর্বশেষ বিভাগ জীবনচরিত-এ রাখা হয়েছে নূম্মো ইকেরাসের লেখা সুপ্রাচীন মধ্য এশীয় নারী কবি এনহেদুয়ানার জীবনী। এনহেদুয়ানা ছিলেন মানব ইতিহাসের প্রথম সাম্রাজ্যের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা আক্কাদের রাজা সরগনের কন্যা। তাঁর বাবা তাঁকে সুমেরীয় শহর উরের কেন্দ্র্রীয় মন্দিরের প্রধান পুরোহিত নিযুক্ত করেছিলেন। এনহেদুয়ানা তাঁর সময়ের রাজনীতি, ধর্ম এবং সাহিত্যে অসাধারণ পরিবর্তনকে প্রভাবিত করেছিল এবং এই পরিবর্তনগুলি ইতিহাসকে পরিণত রূপ দিয়েছিল। এনহেদুয়ানাকে মনে করা হয় ইতিহাসের প্রথম কবি ও লেখক। কবি এনহেদুয়ানা ছিলেন প্রাচীন সুমেরীয় সভ্যতার চন্দ্রদেবতা নান্নার সর্বপ্রধান আরাধিকা। তিনি মহাকাব্য ও বহু মন্দির-স্তোত্রের রচয়িতা, যার মধ্যে ‘দেবী ইনানার মহিমা’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁর রচনাগুলোকে সুমেরীয় ধর্মীয় সাহিত্যে অপরিসীম গুরুত্বপূর্ণ অবদান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে। কবি এনহেদুয়ানার ঝীবন ও কর্মের ইতিবৃত্তটি সংযোজিত করে অমলতাসের সম্পাদক আমাদের বিশেষ ধন্যবাদার্হ হয়েছেন নিঃসন্দেহে। মনোজ্ঞলেকাটির জন্যে তার রচয়িতাকেও সাধুবাদ জানাই।
সার্বিক বিচারে অমলতাসের উদ্বোধনী সংখ্যাটি আমাদের নির্মল সাহিত্য উপভোগের ও উপলব্ধির ছোট অথচ পরিচ্ছন্ন একটা সুযোগ এনে দিয়েছে, এদিক থেকে সাহিত্যঈত্রটি সার্থকনামা হয়েছে বলে মনে করি। তবে অমলতাস ফুলের আরো একটা সুন্দর নাম সোনালু যেমন আছে, একটা খুব অদ্ভুত আর হাস্যকর নামও রয়েছে — বাঁদরলাঠি। সোনালু ফুলের কালো কালো লাঠি আকৃতির যে ফল হয়, তা থেকেই এই কাল্পনিক নামের উৎপত্তি, ঠিক যেভাবে মাশরুমের নাম ‘ব্যাঙের ছাতা’ হয়েছে। অমলতাস সাময়িকী তার সোনালি সাহিত্যপুষ্পের সসম্ভারে আমাদের মনোহরণ করেছে, কিন্তু তার ফল যেন বিদঘুটে বাঁদরলাঠিতে পর্যবসিত না হয়, এটাই আমাদের কামনা।
অমলতাস প্রথম সংখ্যায় অন্তর্ভুক্ত লেখাগুলো নিয়ে আগামীতে আরো বিস্তারিত আলোচনার ইচ্ছা রাখি।


অমলতাস : কবিতাকেন্দ্রিক সাহিত্যপত্র; প্রথম সংখ্যা, ডিসেম্বর, ২০২৫; উপদেষ্টা: আখতারী ইসলাম; সম্পাদক: সাবীনা পারভীন লীনা; সহ-সম্পাদক: রহমান রনি; প্রচ্ছদ: মঈন ফারুক; মুদ্রণ: চন্দ্রবিন্দু, চট্টগ্রাম; সম্পাদকীয় যোগাযোগ : রানা প্যালেস (দ্বিতীয় তলা), কাটাপাহাড় লেন, আন্দরকিল্লা, চট্টগ্রাম; ফোন: ০১৭২৫-৩০৮৮২৯, ইমেল: amaaltas2025@gmail.com; প্রাপ্তিস্থান: চন্দ্রবিন্দু ও বাতিঘর; দাম: ১৫০ টাকা

Leave A Reply


Math Captcha
39 + = 46