আলী প্রয়াস
বিশ্বায়নের এই যুগে উচ্চশিক্ষা আর কেবল জ্ঞানার্জনের একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নয়; এটি এখন একটি বৈশ্বিক প্রতিযোগিতামূলক ক্ষেত্র। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জ্ঞান উৎপাদন, উদ্ভাবন, গবেষণা, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং সমাজ-অর্থনীতির গতিশীল রূপান্তরের অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ফলে বিশ্বজুড়ে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সামনে সবচেয়ে বড় যে প্রশ্নটি ক্রমশ গুরুত্ব পাচ্ছে, তা হলো—গুণগত মান নিশ্চিত করা। এই গুণগত মান যাচাই ও নিশ্চিত করার একটি কার্যকর আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান হলো অ্যাক্রেডিটেশন বা স্বীকৃতিমূলক মাননিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা।
অ্যাক্রেডিটেশন মূলত একটি প্রাতিষ্ঠানিক বা প্রোগ্রামভিত্তিক মূল্যায়ন প্রকরণ। এর মাধ্যমে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাদান পদ্ধতি, পাঠক্রম, গবেষণা কাঠামো, অবকাঠামোগত সক্ষমতা, শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত এবং শিক্ষার ফলাফল আন্তর্জাতিক বা জাতীয় মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না—তা নিরীক্ষণ করা হয়। উন্নত বিশ্বে দীর্ঘদিন ধরে এই ব্যবস্থা কার্যকর থাকলেও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এটি তুলনামূলকভাবে নতুন হলেও দ্রুত গুরুত্ব অর্জন করছে। কারণ উচ্চশিক্ষার বিস্তার যত দ্রুত ঘটছে, ততই প্রয়োজন হচ্ছে একটি কার্যকর মাননিয়ন্ত্রণ কাঠামোর।
বাংলাদেশও এই বৈশ্বিক বাস্তবতার বাইরে নয়। গত দুই দশকে দেশে সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই সম্প্রসারণ উচ্চশিক্ষার সুযোগকে গণতান্ত্রিক করেছে বটে, তবে একই সঙ্গে গুণগত মানের প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে। এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল। এই প্রতিষ্ঠানের প্রধান লক্ষ্য হলো দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একাডেমিক মান মূল্যায়ন ও উন্নয়ন নিশ্চিত করা। এই প্রতিষ্ঠান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাঠক্রম, শিক্ষাপদ্ধতি, গবেষণা কার্যক্রম, অবকাঠামো এবং শিক্ষার্থীদের অর্জিত দক্ষতার ভিত্তিতে প্রোগ্রামসমূহকে মূল্যায়ন করে অ্যাক্রেডিটেশন প্রদান করে থাকে।
এই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে চট্টগ্রামের প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক অর্জন বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। বিশ্ববিদ্যালয়টি ব্যাচেলর অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, বিএ (অনার্স) ইন ইংলিশ, ব্যাচেলর অব লজ (এলএলবি অনার্স), বিএসএস (অনার্স) ইন ইকোনমিক্স এবং বিএসসি ইন ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং—এই পাঁচটি স্নাতক পর্যায়ের প্রোগ্রামের জন্য অ্যাক্রেডিটেশন সনদ অর্জন করেছে। পাশাপাশি কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং প্রোগ্রাম পেয়েছে ‘কনফিডেন্স সার্টিফিকেট’। বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা প্রেক্ষাপটে একাধিক প্রোগ্রামে একযোগে এই স্বীকৃতি পাওয়া নিঃসন্দেহে একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক।
অ্যাক্রেডিটেশনকে উচ্চশিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করার একটি প্রাতিষ্ঠানিক কার্যপ্রণালী হিসেবে দেখা হয়, যেটি মূলত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে—মানদণ্ড নির্ধারণ, মূল্যায়ন এবং ধারাবাহিক উন্নয়ন। এই প্রকরণকৃত প্রচেষ্টা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আত্মসমালোচনার সুযোগ করে দেয় এবং প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা ও গবেষণার কাঠামোকে আরও উন্নত করতে সহায়তা করে। আধুনিক উচ্চশিক্ষা তত্ত্বে এটিকে ‘কোয়ালিটি অ্যাসিওরেন্স মেকানিজম’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। এর ফলে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জবাবদিহিতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতা বৃদ্ধি করে।
প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অর্জনকে সেই বৃহত্তর কাঠামোর মধ্যেই মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে বিশ্ববিদ্যালয়টি শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন, পাঠক্রম আধুনিকায়ন এবং গবেষণার পরিবেশ তৈরির ওপর গুরুত্ব দিয়ে এসেছে। শিল্পখাতের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির লক্ষ্যেও প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ফলস্বরূপ, অ্যাক্রেডিটেশন অর্জন বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি। দীর্ঘদিনের একাডেমিক প্রচেষ্টা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার একটি বাস্তব কার্যপ্রণালী।
সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সাফল্যকে ঘিরে আয়োজিত ‘অ্যাক্রেডিটেশন ফেস্ট’ উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি প্রতীকী ও তাৎপর্যপূর্ণ উদ্যোগ। এ ধরনের আয়োজন শিক্ষাব্যবস্থায় মাননিয়ন্ত্রণের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করে এবং সংশ্লিষ্ট সকল অংশীজনকে আরও দায়িত্বশীল করে তোলে। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, নীতিনির্ধারক এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের উপস্থিতি এই বার্তাই বহন করে যে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা একটি সম্মিলিত প্রয়াস।
আঞ্চলিক উচ্চশিক্ষা বাস্তবতার দৃষ্টিকোণ থেকেও এই অর্জন গুরুত্বপূর্ণ। চট্টগ্রাম বাংলাদেশের একটি প্রধান অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র হলেও দীর্ঘদিন ধরে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে রাজধানীকেন্দ্রিক প্রবণতা লক্ষ করা গেছে। এই প্রেক্ষাপটে চট্টগ্রামের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক প্রোগ্রামে অ্যাক্রেডিটেশন অর্জন আঞ্চলিক উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। এর মাধ্যমে এটি প্রমাণিত হয়, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন উচ্চশিক্ষা প্রদান সম্ভব।
তবে অ্যাক্রেডিটেশনকে চূড়ান্ত গন্তব্য হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বরং এটি একটি চলমান উন্নয়ন প্রচেষ্টার সূচনা। একটি প্রোগ্রাম একবার অ্যাক্রেডিটেশন পেলেই তার মান চিরস্থায়ীভাবে নিশ্চিত হয়ে যায় না; নিয়মিত মূল্যায়ন, পাঠক্রম হালনাগাদ, গবেষণা কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার প্রসার অব্যাহত রাখতে হয়। এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখাই প্রকৃত চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার ভবিষ্যৎও অনেকাংশে এই মাননিয়ন্ত্রণ কাঠামোর ওপর নির্ভর করছে। যদি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিয়মিতভাবে অ্যাক্রেডিটেশন কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে নিজেদের মূল্যায়ন করে এবং মানোন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার গ্রহণ করে, তবে দেশের উচ্চশিক্ষা আন্তর্জাতিক মানচিত্রে আরও দৃশ্যমান হয়ে উঠবে। এর ফলে শুধু শিক্ষার্থীরাই উপকৃত হবে না; দেশের অর্থনীতি, গবেষণা এবং উদ্ভাবন ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক অর্জনকে একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা যেতে পারে। রাজধানী থেকে ভৌগোলিক দূরত্বে থাকা বিশ্ববিদ্যালয় হয়েও প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয় যে গুণগত উৎকর্ষের পথে এগিয়ে যেতে পারে, তা এই সাফল্যের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়েছে। একই সঙ্গে এটি অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্যও একটি অনুপ্রেরণা ও তাদের মানোন্নয়নের পথে আরও সক্রিয় হতে উৎসাহিত করতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, উচ্চশিক্ষার মান নিশ্চিত করার সংগ্রাম মূলত একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাক্রেডিটেশন অর্জন সেই যাত্রাপথের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় মাত্র। বলা যায়, সঠিক দিকনির্দেশনা, প্রাতিষ্ঠানিক অঙ্গীকার এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টা থাকলে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষাও বৈশ্বিক মানদণ্ডে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করতে সক্ষম হবে।
লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক এবং উপ-গ্রন্থাগারিক, প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়।

