Friday, November 6

যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি অঙ্গরাজ্যে ১৯৯৫ সালের একটি হত্যাকাণ্ডের দায়ে ক্রিস্টা গেইল পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছে কারা কর্তৃপক্ষ। তাঁর শরীরে দুই ডোজ প্রাণঘাতী ওষুধ পেন্টোবারবিটাল প্রয়োগের পরও তিনি জীবিত ছিলেন বলে জানিয়েছেন তাঁর আইনজীবীরা।

বুধবার নির্ধারিত সময়ে ন্যাশভিলের রিভারবেন্ড ম্যাক্সিমাম সিকিউরিটি ইনস্টিটিউশনে পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়া শুরু হয়। তবে প্রাণঘাতী ইনজেকশন প্রয়োগের পরও তিনি বেঁচে ছিলেন এবং তাঁকে জোরে নাক ডাকতে শোনা যায় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন। পরে তাঁকে অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নেওয়া হয়।

পাইকের এক আইনজীবী বিবিসিকে জানান, তাঁর শরীরে দুই সিরিঞ্জ পেন্টোবারবিটাল প্রয়োগের পর হাসপাতালে তাঁকে জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে টেনেসি কারেকশন বিভাগের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ডেথ পেনাল্টি ইনফরমেশন সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক রবিন এম মেহার ঘটনাটিকে ‘অনন্য ও নজিরবিহীন’ বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর ভাষ্য, প্রাণঘাতী ইনজেকশনের সময় শিরা খুঁজে না পাওয়ার জটিলতায় অতীতে কয়েকজন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি বেঁচে গেলেও, প্রাণঘাতী ওষুধ শরীরে প্রবেশের পর এমন ঘটনা নজিরবিহীন।

এর আগে বুধবার সকালে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঠিক এক ঘণ্টা আগে ইউএস সিক্সথ সার্কিট কোর্ট অব আপিলস ২-১ ভোটে স্থগিতাদেশ দিয়েছিল। পাইকের আইনজীবীরা যুক্তি দিয়েছিলেন, সাজা দেওয়ার সময় তাঁর শৈশবে যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিযোগসহ কিছু বিষয় যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি।

পরে টেনেসির অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টে নেয়। মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট পরবর্তীতে আপিল আদালতের স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পথ খুলে দেয়। আদালতের রক্ষণশীল সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতিরা এ সিদ্ধান্তের কোনো ব্যাখ্যা দেননি। তবে তিন উদারপন্থি বিচারপতি এতে দ্বিমত পোষণ করেন।

বিচারপতি সোনিয়া সোটোমেয়ার তাঁর ভিন্নমতে বলেন, স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারের মাধ্যমে সিক্সথ সার্কিট আদালতকে পাইকের দাবিগুলো যথাযথভাবে পর্যালোচনার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে।

১৯৯৫ সালের হত্যাকাণ্ড

১৯৯৫ সালের ১২ জানুয়ারি নক্সভিলের একটি কাজের প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে সহপাঠী ১৯ বছর বয়সী কলিন স্লেমারকে হত্যার ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত হন পাইক ও তাঁর তৎকালীন প্রেমিক। ঘটনার সময় পাইকের বয়স ছিল ১৮ বছর।

কৌঁসুলিদের ভাষ্য অনুযায়ী, স্লেমারকে একটি বনাঞ্চলে নিয়ে গিয়ে বক্স কাটার দিয়ে আঘাত এবং বড় পাথর দিয়ে মারধর করা হয়। পরে তাঁর শরীরে শয়তানের প্রতীক হিসেবে পরিচিত একটি পেন্টাগ্রাম আঁকা হয়। মামলাটি সে সময় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

পাইকের তৎকালীন প্রেমিক শিপ ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছিলেন। ঘটনার সময় তাঁর বয়স ছিল ১৭ বছর। তাঁকে প্যারোলে মুক্তির সুযোগসহ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এ মামলায় কেবল পাইকেরই মৃত্যুদণ্ড হয়েছিল।

পাইক হত্যাকাণ্ডে নিজের ভূমিকা অস্বীকার করেননি। তবে তাঁর আইনজীবী ও সমর্থকেরা যুক্তি দিয়েছেন, অপরাধের সময় তাঁর বয়স, মানসিক স্বাস্থ্য এবং শৈশবে যৌন নির্যাতনের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নেওয়া উচিত ছিল।

মৃত্যুদণ্ড নিয়ে বিতর্ক

পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলে টেনেসিতে দুই শতাব্দীরও বেশি সময়ের মধ্যে কোনো নারীর প্রথম মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার ঘটনা ঘটত। ডেথ পেনাল্টি ইনফরমেশন সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুদণ্ড পুনর্বহালের পর দেশটিতে এ পর্যন্ত ১৮ নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে।

চলতি বছর টেনেসিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ক্ষেত্রে এটি দ্বিতীয় ব্যর্থতা। এর আগে মে মাসে ১৯৯৪ সালের তিনজনকে অপহরণ ও হত্যার দায়ে দণ্ডিত টনি ক্যারুদার্সের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময় এক ঘণ্টারও বেশি চেষ্টা করেও শিরায় ইনজেকশনের সুচ প্রবেশ করানো সম্ভব হয়নি। পরে প্রক্রিয়াটি বাতিল করে কর্তৃপক্ষ।

২০২৪ সালে টেনেসি প্রাণঘাতী ইনজেকশনে তিন ধরনের ওষুধের পরিবর্তে শুধু পেন্টোবারবিটাল ব্যবহারের নীতি গ্রহণ করে। এর আগে ওষুধের সঠিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা নিশ্চিত করতে ব্যর্থতার কারণে অস্কার স্মিথের মৃত্যুদণ্ড স্থগিত করতে হয়েছিল অঙ্গরাজ্যটিকে।

এদিকে, নিহত কলিন স্লেমারের মা মে মার্টিনেজ দীর্ঘদিন ধরে পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের অপেক্ষায় ছিলেন। তাঁর বক্তব্য, মেয়েকে হারানোর ঘটনা আজও তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দেয়।

Leave A Reply


Math Captcha
69 − = 64