মরক্কোর রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে ফাতিমা জাহরা এল মানসুরির হাত ধরে। ২০২৬ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর দেশটির রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদ তাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে মরক্কোর ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো নারী সরকারপ্রধানের দায়িত্ব পেলেন।
রাজপ্রাসাদের এক বিবৃতিতে জানানো হয়, রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদ ফাতিমা জাহরা এল মানসুরিকে নতুন সরকার গঠনের দায়িত্ব দিয়েছেন। ২৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে তার দল অথেন্টিসিটি অ্যান্ড মডার্নিটি পার্টি—পিএএম—৩৯৫ আসনের নিম্নকক্ষে ৯৭টি আসন পেয়ে সবচেয়ে বড় দল হিসেবে উঠে আসে। মরক্কোর সংবিধান অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি আসন পাওয়া দলের নেতা বা নেতাকেই রাজা সরকারপ্রধান হিসেবে নিয়োগ দেন।
তবে ৯৭ আসন একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় ১৯৮ আসনের চেয়ে অনেক কম। ফলে নতুন সরকার গঠনে ফাতিমাকে অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে জোট ও সমঝোতায় যেতে হবে। নির্বাচনের পর তিনি সব দলের সঙ্গে সরকার গঠনের আলোচনার বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থানের কথা জানিয়েছেন।
আইনজীবী থেকে রাজনীতির শীর্ষে
১৯৭৬ সালে জন্ম নেওয়া ফাতিমা জাহরা এল মানসুরি পেশায় আইনজীবী। তিনি ফ্রান্সের ইউনিভার্সিটি অব মন্টপেলিয়েতে আইন বিষয়ে উচ্চশিক্ষা নেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটিতে অ্যাংলো-স্যাক্সন ব্যবসায়িক আইন বিষয়ে পড়াশোনা করেন। পেশাজীবনে তিনি আইনচর্চা করেছেন এবং পরে রাজনীতিতে সক্রিয় হন।
২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত পিএএমে যোগ দেওয়ার পর স্থানীয় রাজনীতিতে তার উত্থান শুরু হয়। ২০০৯ সালে তিনি মারাকেশের মেয়র নির্বাচিত হন এবং শহরটির প্রথম নারী মেয়র হিসেবে দায়িত্ব নেন। ২০২১ সালের স্থানীয় নির্বাচনেও তিনি আবার মারাকেশের মেয়র নির্বাচিত হন। পাশাপাশি তিনি সংসদ সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
মারাকেশের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা তাকে নগর উন্নয়ন ও আবাসনসংক্রান্ত রাজনীতিতে পরিচিত করে তোলে। ২০২১ সালের অক্টোবরে প্রধানমন্ত্রী আজিজ আখানুশের সরকারে তিনি জাতীয় ভূ-পরিকল্পনা, নগর উন্নয়ন, আবাসন ও নগরনীতি বিষয়ক মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পান। এ পদে থাকাকালে সরাসরি আবাসন সহায়তা কর্মসূচি, নগর পরিকল্পনা এবং ২০২৩ সালের আল হাউজ ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কাজ করেন।
পিএএমের উত্থান
অথেন্টিসিটি অ্যান্ড মডার্নিটি পার্টি বা পিএএম ২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। দলটির প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে ছিলেন রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদের ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা ফুয়াদ আলি এল হিম্মা। পরবর্তী সময়ে দলটি মরক্কোর গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। ফাতিমা জাহরা এল মানসুরি বর্তমানে দলটির সমষ্টিগত নেতৃত্বের সমন্বয়কের দায়িত্বে রয়েছেন।
২৩ সেপ্টেম্বরের নির্বাচনে পিএএম ৯৭টি আসন পেয়ে প্রথম হয়। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা ন্যাশনাল র্যালি অব ইন্ডিপেন্ডেন্টস (আরএনআই) পেয়েছে ৬৬টি এবং ইস্তিকলাল পার্টি পেয়েছে ৬৫টি আসন। ইসলামপন্থি জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (পিজেডি) পেয়েছে ৫৪টি আসন।
নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল ৩৮ শতাংশ, যা সাম্প্রতিক কয়েকটি নির্বাচনের তুলনায় কম। নতুন সরকারের সামনে তাই জোট গঠনের পাশাপাশি তরুণদের কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি, মজুরি ও জনসেবার মতো বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
আরব বিশ্বে নারী সরকারপ্রধানের নতুন অধ্যায়
ফাতিমা জাহরা এল মানসুরির নিয়োগ মরক্কোর জন্য প্রথম হলেও আরব বিশ্বে তিনি প্রথম নারী সরকারপ্রধান নন। তিউনিসিয়ার নাজলা বুদেন ২০২১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তিউনিসিয়ার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী সারাহ জাফরানি ২০২৫ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনিও আরব বিশ্বের নারী সরকারপ্রধানদের তালিকায় রয়েছেন। ফলে এল মানসুরি আরব বিশ্বে তৃতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিলেন।
নিয়োগের পর দেওয়া বক্তব্যে এল মানসুরি বলেন, মরক্কোর ইতিহাসে প্রথমবার একজন নারী সরকার পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ায় এটি তার নিজের পাশাপাশি দেশের নারীদের জন্যও গর্বের বিষয়।
সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এল মানসুরির প্রথম বড় দায়িত্ব হবে একটি কার্যকর জোট সরকার গঠন করা। এরপর অর্থনৈতিক চাপ, কর্মসংস্থান, তরুণদের প্রত্যাশা এবং জনসেবার মানোন্নয়ন নিয়ে তাকে কাজ করতে হবে।
এর পাশাপাশি তার সরকারের অন্যতম বড় দায়িত্ব হবে ২০৩০ সালের ফিফা বিশ্বকাপ আয়োজনের প্রস্তুতি তদারক করা। মরক্কো স্পেন ও পর্তুগালের সঙ্গে যৌথভাবে ওই বিশ্বকাপ আয়োজন করবে। এ উপলক্ষে দেশটিতে বড় আকারের অবকাঠামো বিনিয়োগ ও উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
আইনজীবী থেকে মারাকেশের প্রথম নারী মেয়র, এরপর জাতীয় সরকারের মন্ত্রী এবং শেষ পর্যন্ত দেশের প্রথম নারী সরকারপ্রধান—ফাতিমা জাহরা এল মানসুরির রাজনৈতিক যাত্রায় এবার যুক্ত হলো নতুন এক ঐতিহাসিক অধ্যায়।

