নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ বলেছেন, বিশ্ব এমন একটি সরবরাহব্যবস্থা তৈরি করেছে, যেখানে যুদ্ধের জন্য অস্ত্র দ্রুত পৌঁছে যায়, কিন্তু দরিদ্র কৃষকের কাছে সময়মতো সার ও জ্বালানি পৌঁছায় না। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে দেওয়া প্রথম ভাষণে তিনি জলবায়ু ন্যায়বিচার, বৈশ্বিক বৈষম্য ও আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।
২৪ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে দেওয়া ভাষণের শুরুতেই সাম্প্রতিক বন্যায় নেপালে ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির কথা তুলে ধরেন বালেন্দ্র শাহ। তিনি বলেন, হিমালয় অঞ্চলে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা শুধু নেপালের স্থানীয় কোনো দুর্যোগ নয়, এটি গোটা বিশ্বের জন্য একটি সতর্কবার্তা।
জলবায়ু পরিবর্তন কোনো সীমান্ত মানে না উল্লেখ করে নেপালের প্রধানমন্ত্রী বলেন, হিমবাহ ও বন্যার পানির পাসপোর্ট বা ভিসা লাগে না। উষ্ণ হয়ে ওঠা জলবায়ু হিমালয়ের পরিবেশব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করছে এবং হিমবাহ গলে যাওয়া, পাহাড়ধস, বন্যা ও অন্যান্য দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
বালেন্দ্র শাহ বলেন, বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে নেপালের অবদান ০.১ শতাংশেরও কম। দেশটি জলবায়ু সংকট তৈরি করেনি, অথচ এর জন্য নেপালকে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে। দুর্যোগে সড়ক, সেতু, স্কুল, ঘরবাড়ি, কৃষিজমি ও মানুষের জীবিকা ধ্বংস হচ্ছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে এসব পুনর্গঠনে ঋণ করতে হচ্ছে।
তিনি জলবায়ু ন্যায়বিচারকে শুধু জাতিসংঘের নথিতে থাকা একটি ধারণা হিসেবে না রেখে বাস্তবে প্রয়োগের আহ্বান জানান। ঐতিহাসিকভাবে জলবায়ু সংকটে বেশি অবদান রাখা এবং মোকাবিলায় বেশি সক্ষম দেশগুলোর আরও বেশি দায়িত্ব নেওয়া উচিত বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
হিমালয় অঞ্চলের জন্য নেপাল, ভারত ও চীনের নেতৃত্বে একটি ‘হিমালয়ান ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স মেকানিজম’ গঠনের প্রস্তাব দেন বালেন্দ্র শাহ। এর মাধ্যমে স্যাটেলাইট তথ্য ও বিশেষজ্ঞ জ্ঞান ভাগাভাগি, ঝুঁকিপূর্ণ হিমবাহ-হ্রদ পর্যবেক্ষণ, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং দুর্যোগের সময় আন্তঃসীমান্ত সহযোগিতা বাড়ানোর কথা বলেন তিনি।
দুর্যোগ মোকাবিলায় ছয়টি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান নেপালের প্রধানমন্ত্রী—ত্রাণ, পুনর্বাসন, পুনর্গঠন, দায়িত্ব, ক্ষতিপূরণ ও স্থিতিস্থাপকতা। তার মতে, জলবায়ুজনিত দুর্যোগে দরিদ্র দেশের অবকাঠামো ধ্বংস হলে সমাধান শুধু নতুন ঋণ বা ছোট ছোট অনুদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না; পর্যাপ্ত অনুদানভিত্তিক সহায়তাও প্রয়োজন।
ভাষণে বর্তমান বৈশ্বিক ব্যবস্থার বৈষম্যের বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি। তার ভাষায়, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা এমন হওয়া উচিত যেখানে সার্বভৌমত্ব, আন্তর্জাতিক আইন ও মানুষের মর্যাদা গুরুত্বপূর্ণ হবে এবং ছোট ও দুর্বল দেশগুলো শুধু শক্তিশালী দেশগুলোর সিদ্ধান্ত মেনে নিতে বাধ্য হবে না।
বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা নিয়ে তিনি বলেন, নেপালের একজন কৃষক সময়মতো সার পাচ্ছেন না, মহাসড়ক নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী পাওয়া যাচ্ছে না, অথচ আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র, রাইফেল ও গোলাবারুদ সীমান্ত পেরিয়ে দ্রুত পৌঁছে যাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমরা এমন একটি বিশ্ব তৈরি করেছি, যেখানে যুদ্ধের জন্য নিখুঁত সরবরাহব্যবস্থা আছে, কিন্তু খাদ্যের জন্য সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে।’
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের নামও উল্লেখ করেন বালেন্দ্র শাহ। তিনি বলেন, বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত, মালদ্বীপ, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কাসহ এ অঞ্চলের অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতাও একই—তারা যে জলবায়ু সংকট তৈরি করেনি, তার আঘাত তাদের মোকাবিলা করতে হচ্ছে; একইভাবে তারা শুরু করেনি এমন যুদ্ধের প্রভাবও তাদের ওপর পড়ছে।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে এ বছর সবচেয়ে কম বয়সী সরকারপ্রধান হিসেবে ভাষণ দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে বালেন্দ্র শাহ বলেন, তিনি বয়সের কারণে আলোচনায় আসতে চান না। বরং ছোট ও দরিদ্র দেশগুলোর কণ্ঠ যাতে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় গুরুত্ব পায়, সে জন্য বহুপাক্ষিক সহযোগিতা জোরদারের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন তিনি।
ভাষণের শেষাংশে নেপালের তরুণদের সততা ও জবাবদিহির রাজনীতির দাবির কথা উল্লেখ করেন তিনি। তার মতে, এই প্রজন্মগত পরিবর্তন শুধু নেপালের জাতীয় ঘটনা নয়; এটি সংঘাত, বৈষম্য ও সুযোগের অভাবের বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে তরুণদের জেগে ওঠার অংশ।
বালেন্দ্র শাহ বলেন, সবচেয়ে দুর্বলদের হাতে যখন সবচেয়ে কম ক্ষমতা থাকে, সেই বৈশ্বিক ব্যবস্থা সংস্কার করতে হবে। একই সঙ্গে পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ থেকে নতুন কোনো দুর্যোগের সতর্কবার্তা এলে তা শুনে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য বিশ্বকে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানান তিনি।

