নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ বন্যায় মৃতের সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়েছে। তবে এই বিপর্যয়ের প্রভাব শুধু নেপালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকার আশঙ্কা নেই; ভারতের বিস্তীর্ণ এলাকাও এর ঝুঁকিতে রয়েছে। বৃহস্পতিবার বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেপালের পাহাড়ে অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা, ভূমিধস কিংবা হিমবাহজনিত বিপর্যয়ের প্রভাব সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের সমতল অঞ্চলেও পৌঁছাতে পারে।
নেপালে ছয় হাজারের বেশি নদী ও জলধারা রয়েছে। এসব নদীর অধিকাংশই দক্ষিণমুখী হয়ে ভারত দিয়ে প্রবাহিত হয়ে গঙ্গা অববাহিকায় মিশেছে। পূর্বাঞ্চলের কোসি, মধ্যাঞ্চলের গন্ডক, পশ্চিমাঞ্চলের কর্নালি এবং পশ্চিম সীমান্তের মহাকালী ছাড়াও বাগমতী, কমলা, রাপ্তি ও বাবাইয়ের মতো নদীগুলো বর্ষাকালে দ্রুত ভয়ংকর রূপ নিতে পারে।
আন্তর্জাতিক পর্বত উন্নয়ন কেন্দ্রের জলবিদ মনীশ শ্রেষ্ঠের মতে, নেপাল থেকে ভারতের সমতলে নেমে আসা সাত থেকে নয়টি প্রধান নদী দেশটির বন্যাঝুঁকির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের কেন্দ্রীয় জল কমিশনও কোসি, গন্ডক, বাগমতী ও ঘাঘরাকে প্রধান আন্তঃসীমান্ত নদী হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে বিহার। উত্তর বিহারের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ এলাকা সরকারি হিসাবে বন্যাপ্রবণ। কোসি—যাকে ‘বিহারের দুঃখ’ বলা হয়—গন্ডক, বাগমতী ও কমলার মতো গুরুত্বপূর্ণ নদীগুলোর উৎস নেপালে। ফলে নেপালে অতিবৃষ্টি ও আকস্মিক বন্যার প্রভাব সহজেই বিহারের বিস্তীর্ণ এলাকায় পড়তে পারে।
পূর্ব উত্তরপ্রদেশও রয়েছে ঝুঁকিতে। ঘাঘরা, রাপ্তি ও গন্ডক নদীর কারণে গোরখপুর, বাহরাইচ, লখিমপুর খেরি ও শ্রাবস্তীর মতো জেলায় প্রায়ই বন্যা দেখা দেয়। উত্তরবঙ্গেও মেচি ও মহানন্দা নদীর জলপ্রবাহের প্রভাব রয়েছে। আইসিআইএমওডির জলবিদ প্রদীপ মন ডাঙ্গোলের মতে, ঝুঁকির ব্যাপ্তির দিক থেকে বিহার সবচেয়ে বেশি এবং উত্তরপ্রদেশ দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে।
তবে নেপালে বন্যা হলেই একই মাত্রায় ভারতের বিস্তীর্ণ এলাকায় বিপর্যয় নেমে আসবে—বিষয়টি এতটা সরল নয়। নেপালের কোথায় ও কতটা বৃষ্টি হয়েছে, নদীতে কত পলি জমেছে, ভারতের গঙ্গায় তখন পানির উচ্চতা কত, বাঁধের অবস্থা এবং জলনিকাশি ব্যবস্থা কতটা কার্যকর—এসব বিষয়ের ওপর বিপর্যয়ের মাত্রা নির্ভর করে।
২০০৮ সালের কোসি বিপর্যয় এর বড় উদাহরণ। নেপালে বাঁধ ভেঙে বিহারে ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছিল, যাতে প্রায় ৪০০ মানুষের মৃত্যু হয়। আইআইটি কানপুরের অধ্যাপক রাজীব সিনহার মতে, ওই সময় নদীতে বাঁধের ধারণক্ষমতার মাত্র প্রায় এক-দশমাংশ পানি ছিল। অর্থাৎ অস্বাভাবিক পানিপ্রবাহের চেয়ে দুর্বল ও যথাযথভাবে রক্ষণাবেক্ষণ না করা বাঁধই তখন বড় বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
সাধারণ বর্ষায় নেপালের পাহাড় থেকে বন্যার পানি বিহারের সমতলে পৌঁছাতে প্রায় এক দিন সময় লাগতে পারে। তবে চুরে পাহাড়ি অঞ্চলে আকস্মিক বন্যা হলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেই পানি নিচের দিকে নেমে আসতে পারে। সাম্প্রতিক এক ঘটনায় রাসুয়া থেকে ভারতের সীমান্তবর্তী ত্রিবেণী এলাকায় বন্যার ঢেউ পৌঁছাতে মাত্র সাড়ে সাত ঘণ্টা লেগেছিল।
এর সঙ্গে নতুন করে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে হিমালয়ের পরিবর্তিত পরিবেশ। ২০২১ সালের চামোলি এবং ২০২৫ সালের ধরালি বিপর্যয়ের মতো ঘটনায় পানি, বরফ, পাথর ও বিপুল পরিমাণ পলি মিশে ভয়ংকর স্রোত তৈরি হয়েছিল। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে চরম বৃষ্টিপাত বাড়ছে এবং উষ্ণায়নের ফলে বায়ুমণ্ডলে বেশি জলীয়বাষ্প জমছে। একই সঙ্গে গলতে থাকা পারমাফ্রস্ট, হিমবাহ-হ্রদের আকস্মিক জলমুক্তি এবং শিলা ও বরফধসের ঝুঁকিও বাড়ছে।
ফলে নেপাল-তিব্বত সীমান্তের সাম্প্রতিক বন্যা শুধু একটি স্থানীয় দুর্যোগ নয়; এটি হিমালয় থেকে নেমে আসা আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর মাধ্যমে ভারতের বিস্তীর্ণ সমতল অঞ্চলের জন্যও বড় ধরনের সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

