মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। ইরাকে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেসের (পিএমএফ) একাধিক ঘাঁটিতে বুধবার ভোরে যৌথ সামরিক অভিযান চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব। এতে অন্তত ২০ জন নিহত এবং ৩০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। একই সময়ে জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরান। এ ঘটনার জেরে ইরানকে ‘চড়া মূল্য’ দিতে হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্র ইরানে বোমা হামলা স্থগিত করার পর ইরানও পাল্টা হামলা বন্ধের ঘোষণা দিয়েছিল। এমন পরিস্থিতিতে নতুন করে সামরিক অভিযান মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
পিএমএফের ঘাঁটিতে একযোগে হামলা
ইরাকের বাগদাদ, নিনেভে, বসরা, কিরকুক, কারবালা, দিয়ালা ও ওয়াসিত প্রদেশে পিএমএফের একাধিক সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। ওয়াশিংটন ও রিয়াদের দাবি, সৌদি আরবের তেল স্থাপনায় ড্রোন হামলার জবাব হিসেবেই এই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।
পিএমএফ জানিয়েছে, হামলায় অন্তত ২০ জন সদস্য নিহত এবং ৩২ জন আহত হয়েছেন। আহতদের অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদি পরিস্থিতি পর্যালোচনায় জরুরি নিরাপত্তা বৈঠক আহ্বান করেছেন। দেশটির প্রেসিডেন্ট নিজার আমেদি এ হামলাকে ইরাকের সার্বভৌমত্বের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করে এর তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন।
এদিকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও যৌথ সামরিক অভিযানের নিন্দা জানিয়ে অভিযোগ করেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররাই মধ্যপ্রাচ্যকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলছে।
জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে ইরান আকস্মিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। তবে মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছে।
জর্ডানের সেনাবাহিনী দাবি করেছে, তারা পাঁচটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে।
অন্যদিকে, ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জানিয়েছে, তারা জর্ডানে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে একাধিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী তিনটি তেলবাহী ট্যাংকারেও হামলার দাবি করেছে তারা।
তবে কোন হামলাটি আগে সংঘটিত হয়েছে—ইরাকে যুক্তরাষ্ট্র-সৌদি অভিযান নাকি জর্ডানে ইরানের হামলা—তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ট্রাম্পের কঠোর হুঁশিয়ারি
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “ইরানকে এর জন্য চড়া মূল্য দিতে হবে।”
তিনি দাবি করেন, মার্কিন বাহিনী ক্ষেপণাস্ত্রগুলো লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছানোর আগেই ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে। পাশাপাশি তিনি জানান, ইরাকে পরিচালিত সামরিক অভিযান ইরাকি সরকারের সমন্বয়েই চালানো হয়েছে।
ট্রাম্প ইরান-সমর্থিত শিয়া মিলিশিয়াদের ‘বিশ্বের জন্য ক্যানসার’ বলে মন্তব্য করে ভবিষ্যতে আরও কঠোর সামরিক পদক্ষেপের ইঙ্গিত দিয়েছেন।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন করে পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগরকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা নতুন করে হুমকির মুখে পড়তে পারে।
পাকিস্তান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং উপসাগরীয় দেশগুলো পরিস্থিতি শান্ত করার আহ্বান জানিয়েছে। জাতিসংঘে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত আসিম ইফতিখার আহমদ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে পূর্ববর্তী সমঝোতার শর্ত মেনে দ্রুত আলোচনায় ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের ধারণা, কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত থাকলেও আপাতত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি সামরিক পদক্ষেপ অব্যাহত থাকতে পারে, যা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলবে।

