Friday, November 6

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে অনুষ্ঠিত আন্দোলনের পর গ্রেফতার হওয়া ১৪ জনের মধ্যে ১৩ জনই মুসলিম সম্প্রদায়ের হওয়ায় নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। গ্রেফতারকৃতদের বিরুদ্ধে রাজ্যের নতুন ‘গুন্ডা আইন’ প্রয়োগের ঘোষণাকে কেন্দ্র করে মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবী ও বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

গত ২৪ জুলাই আটটি বামপন্থী ছাত্র সংগঠন ও একাধিক সামাজিক-রাজনৈতিক গোষ্ঠীর যৌথ উদ্যোগে কলকাতায় একটি প্রতিবাদ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। দিল্লিতে শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি নির্যাতনের প্রতিবাদ, সাবেক কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ, ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি (এনটিএ) বিলুপ্তি এবং নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের জবাবদিহিতা দাবি ছিল এ কর্মসূচির মূল বিষয়।

পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ জানিয়েছে, আন্দোলন-পরবর্তী কথিত সহিংসতার ঘটনায় ৭০ জনকে শনাক্ত করা হয়েছে। এ ঘটনায় সাতটি মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে নতুন ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল পাবলিক সেফটি অ্যান্ড কন্ট্রোল অব অ্যান্টি-সোশ্যাল অ্যাক্টিভিটিস অ্যাক্ট, ২০২৬’ বা ‘গুন্ডা আইন’-এর ধারা যুক্ত করা হয়েছে।

রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী একাধিক বক্তব্যে রাজাবাগান, খিদিরপুর, একবালপুর ও ওয়াটগঞ্জ এলাকার কয়েকজনের নাম উল্লেখ করে বলেন, নতুন আইনের আওতায় এমন ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যা তারা “তিন প্রজন্ম মনে রাখবে।” তিনি আন্দোলনকারীদের ‘শুক্রবারের লোক’ বলেও মন্তব্য করেন, যা নিয়ে সাম্প্রদায়িক ইঙ্গিতের অভিযোগ উঠেছে।

পরবর্তীতে তিনি দাবি করেন, আন্দোলনে অংশ নেওয়া অনেকেই শিক্ষার্থী ছিলেন না এবং মুসলিম অধ্যুষিত বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজনকে আনা হয়েছিল। এমনকি তিনি অভিযোগ করেন, আন্দোলনের পেছনে “ইসলামিক মৌলবাদী” ও বিদেশি শক্তির মদদ থাকতে পারে।

নতুন ‘গুন্ডা আইন’ নিয়ে সমালোচনা

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় সম্প্রতি পাস হওয়া দুটি আইনের মধ্যে অন্যতম এই ‘গুন্ডা আইন’-এ একজন ব্যক্তিকে ‘সমাজবিরোধী’ হিসেবে চিহ্নিত করে ১২ মাস পর্যন্ত আটক রাখার সুযোগ রয়েছে। আইনটিতে জামিন-সংক্রান্ত কঠোর বিধান, নির্দিষ্ট এলাকা থেকে বহিষ্কার, তল্লাশি ও সম্পত্তি ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

মানবাধিকারকর্মীদের অভিযোগ, ‘গুন্ডা’ শব্দটির সংজ্ঞা অত্যন্ত অস্পষ্ট হওয়ায় আইনটি রাজনৈতিক বিরোধী মত দমনে ব্যবহার হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। আইনটির সাংবিধানিক বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে আদালতে জনস্বার্থ মামলাও করা হয়েছে।

গ্রেফতার ব্যক্তিদের পরিবার যা বলছে

গ্রেফতার হওয়া সালমান হোসেনের পরিবারের দাবি, তিনি আন্দোলনে সহিংসতায় অংশ নেননি। বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে তাঁকে রাস্তার আবর্জনা পরিষ্কার করতে দেখা গেছে। তাঁর ভাই ইমরান বলেন, “যদি কোনো ভিডিওতে প্রমাণ পাওয়া যায় যে আমার ভাই সাংবাদিকদের ওপর হামলা করেছে, আমি নিজেই তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনের প্রয়োগ সমর্থন করব। কিন্তু কোনো প্রমাণ ছাড়াই তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে।”

আন্দোলনের সমর্থকরা বলছেন, শিক্ষা ব্যবস্থার সংকটের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার জন্য কোনো ব্যক্তির নিট পরীক্ষার্থী হওয়া আবশ্যক নয়। একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ ও শিক্ষাব্যবস্থার স্বচ্ছতা পুরো সমাজের সঙ্গে সম্পর্কিত।

সাম্প্রদায়িক বৈষম্যের অভিযোগ

আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মীদের একাংশের দাবি, মুসলিম পরিচয়কে কেন্দ্র করে আন্দোলনকারীদের লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। তাঁদের মতে, প্রতিবাদে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে মুসলিমদের বেছে বেছে গ্রেফতার করে আন্দোলনটিকে সাম্প্রদায়িক রূপ দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।

অধিকারকর্মীদের ভাষ্য, ভারতের সংবিধান নাগরিকদের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার দিয়েছে। সেই অধিকার চর্চাকে অপরাধ হিসেবে উপস্থাপন করা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থী।

এদিকে, গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের খালি পায়ে ঘটনাস্থলে নিয়ে গিয়ে ‘ঘটনাপ্রবাহ পুনর্নির্মাণ’-এর ঘটনায়ও তীব্র সমালোচনা দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন দাবি করেছে, এটি অভিযুক্তদের মানবিক মর্যাদার পরিপন্থী এবং যথাযথ বিচারিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

নিট আন্দোলন-পরবর্তী এই ঘটনাকে ঘিরে পশ্চিমবঙ্গে আইন, মানবাধিকার, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের অধিকার নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক শুরু হয়েছে।

Leave A Reply


Math Captcha
2 + 1 =