নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি:
গ্যাস সংকটে নারায়ণগঞ্জের তৈরি পোশাকশিল্পে নেমে এসেছে বড় ধরনের স্থবিরতা। গ্যাসের অভাবে ডাইং কারখানায় কাপড় রং করা যাচ্ছে না। ফলে ডাইং থেকে কাপড় সরবরাহ না হওয়ায় থেমে যাচ্ছে গার্মেন্টসের কাটিং, সেলাই, ফিনিশিং ও প্যাকেজিং। সময়মতো বিদেশে পণ্য পাঠাতে না পারায় চুক্তি অনুযায়ী বিদেশি ক্রেতারা বিল থেকে ৫ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ কেটে রাখছেন। এতে একদিকে বাড়ছে উদ্যোক্তাদের লোকসান, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে কমছে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের প্রতি ক্রেতাদের আস্থা। নতুন অর্ডার পাওয়াও অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে।
শিল্প-সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, চলমান জ্বালানি সংকটে দেশের তৈরি পোশাক খাত এরই মধ্যে প্রায় এক বিলিয়ন ডলারের ক্ষতির মুখে পড়েছে। নারায়ণগঞ্জের প্রায় ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ২০০টি পোশাকশিল্প-সংশ্লিষ্ট কারখানাও বহুমুখী সংকটে পড়েছে। কয়েক সপ্তাহে জেলার বিভিন্ন কারখানায় উৎপাদন ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে বলে দাবি উদ্যোক্তাদের।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ডাইং শিল্প। গ্যাসের অভাবে কাপড় রং ও শুকানোর কাজ ব্যাহত হওয়ায় এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে পুরো উৎপাদন চেইনে। ডাইংয়ে উৎপাদন কমে যাওয়ায় গার্মেন্টসে কাপড় পৌঁছাতে দেরি হচ্ছে। ফলে কাটিং, সেলাই, ফিনিশিং ও প্যাকেজিংয়েও ধীরগতি দেখা দিয়েছে। সময়মতো শিপমেন্ট দিতে না পারায় এর প্রভাব পড়ছে দেশের রপ্তানি আয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানের ওপর।
শিল্প-সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জে প্রায় ২ হাজার ২০০টি পোশাকশিল্প-সংশ্লিষ্ট কারখানায় প্রায় ২০ লাখ শ্রমিক কাজ করেন। একটি পোশাক তৈরির পুরো প্রক্রিয়ায় ডাইং, নিটিং, অ্যাকসেসরিজ, কাটিং, সেলাই, ফিনিশিং ও প্যাকেজিং পরস্পরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। ফলে ডাইং শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত হলে তার প্রভাব পড়ে পুরো উৎপাদন ব্যবস্থায়। গ্যাস সংকটে জেলার দেড় শতাধিক ডাইং কারখানার উৎপাদন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।
উদ্যোক্তারা জানান, কোনো কোনো কারখানায় দৈনিক ৩০ টন কাপড় রং করার সক্ষমতা থাকলেও বর্তমানে উৎপাদন নেমে এসেছে মাত্র ১ থেকে ২ টনে। এর আগে অনেক প্রতিষ্ঠান সিএনজি স্টেশন থেকে সিলিন্ডারে গ্যাস এনে সীমিত আকারে উৎপাদন চালিয়ে গেলেও নতুন নির্দেশনার কারণে সেই সুযোগও বন্ধ হয়ে গেছে। মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে যান্ত্রিক ত্রুটির পর জাতীয় গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ার প্রভাব নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চলে সবচেয়ে বেশি পড়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে গ্যাস সংকট, উৎপাদন ব্যাহত হওয়া ও ছুটি সমন্বয়ের কারণে গত বৃহস্পতিবার নারায়ণগঞ্জের বেশিরভাগ তৈরি পোশাক কারখানা বন্ধ রাখা হয়। শহরের পুলিশ লাইন্স এলাকার রহমান গার্মেন্টসসহ অনেক প্রতিষ্ঠান গত বুধবারের সরকারি ছুটি ও শুক্রবারের সাপ্তাহিক ছুটির সঙ্গে মিলিয়ে বৃহস্পতিবার ছুটি দেয়। আগের শুক্রবার অতিরিক্ত কাজ করিয়ে এই ছুটি সমন্বয় করা হয়।
ফতুল্লার বিসিক শিল্পনগরীর বেশিরভাগ গার্মেন্টসও বৃহস্পতিবার বন্ধ ছিল। তবে গার্মেন্টস বন্ধ থাকায় বিদ্যুতের ওপর চাপ কম থাকায় ৪৬৫টি নিটিং কারখানায় পোশাক তৈরির প্রয়োজনীয় থান কাপড় উৎপাদন অব্যাহত রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) তথ্য অনুযায়ী, বিসিক শিল্পনগরীতে মোট ২৫৬টি গার্মেন্টস কারখানার মধ্যে গত দুই বছরে ১২২টি বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে চালু থাকা ১৩৪টি কারখানার বেশিরভাগই বৃহস্পতিবার বন্ধ ছিল। বিসিকের বাইরের রপ্তানিমুখী ও সাব-কন্ট্রাক্টভিত্তিক অধিকাংশ কারখানাও একইভাবে ছুটি দিয়েছে।
একসময় ‘প্রাচ্যের ডান্ডি’ হিসেবে পরিচিত নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চলে পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। গত এক বছরে জেলায় দুই ডজনের বেশি পোশাক কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে। কর্মহীন হয়েছেন প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার শ্রমিক। ব্যবসায়ীদের মতে, গ্যাস সংকটের সঙ্গে উচ্চ সুদহার, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, শ্রমিক অসন্তোষ ও উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার সম্মিলিত প্রভাবে শিল্প খাত কঠিন সময় পার করছে।
বিকেএমইএর সিনিয়র সহসভাপতি মোর্শেদ সারোয়ার সোহেল বলেন, কয়েক সপ্তাহ ধরে গ্যাস সংকটের কারণে জেলার বিভিন্ন কারখানায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ উৎপাদন কমে গেছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ডাইং শিল্প। ডাইংয়ে উৎপাদন না থাকায় গার্মেন্টসে কাপড় পৌঁছাতে দেরি হচ্ছে। ফলে কাটিং, সেলাই ও ফিনিশিং ব্যাহত হচ্ছে এবং সময়মতো শিপমেন্ট দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি বলেন, বিদেশি ক্রেতারা চুক্তি অনুযায়ী ৫ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ কেটে রাখছেন। এতে আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের প্রতি আস্থাও কমছে। সামনে নতুন অর্ডার পাওয়া নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মোর্শেদ সারোয়ার সোহেল আরও বলেন, একটি বড় গার্মেন্টস কারখানা একদিন বন্ধ থাকলে প্রায় ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়। মাঝারি আকারের কারখানার ক্ষেত্রেও প্রতিদিন ২০ থেকে ৪০ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়। উৎপাদন না থাকলেও শ্রমিকদের বেতনসহ অন্যান্য স্থায়ী ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। তবে চলতি মাসেই গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হবে বলে আশ্বাস পাওয়া গেছে।
ফতুল্লার পঞ্চবটী বিসিক হোসিয়ারি পল্লি মালিক সমিতির পরিচালক শহীদুল ইসলাম বলেন, গার্মেন্টস কারখানার বেশিরভাগ বন্ধ থাকলেও ৪৬৫টি নিটিং কারখানা চালু থাকবে। গার্মেন্টস বন্ধ থাকায় বিদ্যুতের ওপর চাপ কমবে। সেই সুযোগে নিটিং কারখানাগুলোতে গার্মেন্টসের জন্য প্রয়োজনীয় থান কাপড় উৎপাদন করা হবে।
বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ব্যবসায়ী সংগঠনের হিসাবে চলমান জ্বালানি সংকটের কারণে দেশের তৈরি পোশাক খাত এরই মধ্যে প্রায় এক বিলিয়ন ডলারের ক্ষতির মুখে পড়েছে। সময়মতো উৎপাদন ও শিপমেন্ট দিতে না পারায় অনেক বিদেশি ক্রেতা নতুন অর্ডার দিতে অনাগ্রহী হয়ে পড়ছেন। ফলে এসব অর্ডার ধীরে ধীরে ভিয়েতনাম ও ভারতের মতো প্রতিযোগী দেশগুলোতে চলে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহের নিশ্চয়তা না দেওয়া গেলে একের পর এক শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাবে, বেকারত্ব বাড়বে এবং শিল্প খাতে অনিশ্চয়তা আরও গভীর হবে। এর ফলে দেশের অর্থনীতিও ভঙ্গুর অবস্থার দিকে এগিয়ে যেতে পারে।

