একসময় স্বপ্ন ছিল জাতীয় দলের জার্সিতে ক্রিকেট খেলার। চট্টগ্রামের মাঠে বাঁহাতি লেগ স্পিনার হিসেবে প্রশংসাও কুড়িয়েছিলেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন ভেঙে অপরাধের অন্ধকার জগতে পা রাখেন মোবারক হোসেন ওরফে ডেভিড ইমন। মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে তিনি হয়ে ওঠেন চট্টগ্রামের অন্যতম আলোচিত শীর্ষ সন্ত্রাসী। তাঁর বিরুদ্ধে রয়েছে হত্যা, চাঁদাবাজি, অস্ত্রবাজিসহ অন্তত ১৫টি মামলার অভিযোগ।
গত মঙ্গলবার রাতে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার সময় যশোর সীমান্ত এলাকা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলীর হয়ে বর্তমানে চট্টগ্রামে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় নেতৃত্ব দেওয়া দুজনের একজন ছিলেন ডেভিড ইমন।
পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক নাজিমুল হক জানান, চার দিন আগে যশোর সীমান্ত দিয়ে দেশে প্রবেশ করেছিলেন ইমন। পুলিশের অভিযানের খবর পেয়ে তিনি পুনরায় ভারতে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর কাছে দেশি ও বিদেশি দুটি পাসপোর্ট থাকার তথ্যও পুলিশের কাছে রয়েছে।
ক্রিকেট মাঠ থেকে অপরাধজগতে
চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর এলাকার বাসিন্দা ডেভিড ইমন ছোটবেলা থেকেই ক্রিকেটের প্রতি আগ্রহী ছিলেন। সাইকেলে করে ফটিকছড়ি কলেজ মাঠে অনুশীলনে যেতেন। পরে নগরের অক্সিজেন এলাকায় খালার বাসায় থেকে নিয়মিত ক্রিকেট প্রশিক্ষণ নেন। তিনি চট্টগ্রাম ব্রাদার্স একাডেমিতে খেলতেন এবং কাজীর দেউড়ি স্টেডিয়ামে অনুশীলন করতেন।
চট্টগ্রাম ব্রাদার্স একাডেমির সাবেক কোচ আমিনুল হক জানান, ইমন একজন প্রতিভাবান বাঁহাতি লেগ স্পিনার ছিলেন। জাতীয় দলের খেলোয়াড় কিংবা বিদেশি দলের ক্রিকেটাররা চট্টগ্রামে এলে নেট বোলার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতেন তিনি। তবে ২০২০ সালের পর হঠাৎ করেই ক্রিকেট থেকে হারিয়ে যান।
স্থানীয়দের মতে, তিনি ভালো ক্রিকেটার হিসেবে নিজ এলাকার সুনাম বাড়াতে পারতেন। কিন্তু সেই সম্ভাবনা নষ্ট করে অপরাধের পথ বেছে নেন।
ছাত্রলীগের রাজনীতি থেকে সন্ত্রাসের জগতে
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, রহমানিয়া উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করার পর কলেজে ভর্তি হলেও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দেননি ইমন। ২০২০ সালে করোনা মহামারির সময় তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সক্রিয় হন এবং চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবু তৈয়বের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিতি পান।
২০২২ সালে তিনি ওমানে যান এবং এক বছর পর দেশে ফিরে আসেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আত্মগোপনে চলে গিয়ে বায়েজীদ বোস্তামী এলাকার আতুরার ডিপো এলাকায় অবস্থান শুরু করেন। সেখানেই শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়।
পুলিশের দাবি, ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘর্ষে সক্রিয় ভূমিকার কারণে বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদের আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন তিনি।
একের পর এক হত্যা মামলার আসামি
পুলিশ জানিয়েছে, ২০২৫ সালের ৩০ মার্চ বাকলিয়া এলাকার জোড়া খুন, ২৩ মে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত এলাকায় সন্ত্রাসী ঢাকাইয়া আকবর হত্যা, হাটহাজারীতে জোড়া খুন এবং চান্দগাঁওয়ে আফতাব হত্যা মামলাসহ বিভিন্ন ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে অন্তত ১৫টি মামলা রয়েছে।
৫ আগস্টের পর বিভিন্ন থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র হাতে তাঁর একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভাষ্য, অস্ত্র ব্যবহারে তিনি অত্যন্ত দক্ষ এবং একাধিক হত্যাকাণ্ডে সরাসরি কিংবা পরিকল্পনাকারী হিসেবে তাঁর সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে।
বিদেশি নম্বর থেকে কোটি টাকার চাঁদাবাজি
বর্তমানে বিদেশে অবস্থানরত শীর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদের হয়ে চট্টগ্রামে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনার অন্যতম নেতৃত্বদানকারী হিসেবে ডেভিড ইমনের নাম উঠে এসেছে।
পুলিশের দাবি, তাঁর নেতৃত্বাধীন চক্রে অন্তত ৫০ জন শুটার ও সহযোগী সক্রিয় রয়েছে। ব্যবসায়ী, প্রবাসী ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মালিকদের বিদেশি নম্বর থেকে ফোন করে কোটি কোটি টাকা চাঁদা দাবি করতেন তিনি।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে এক রাজনৈতিক নেতাকে ফোন করে হত্যার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। এছাড়া বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মালিকদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হতো বলে অভিযোগ করেছে পুলিশ।
গত ১৩ জুলাই নগরের একটি ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনাতেও তাঁর সহযোগীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। হামলার আগে প্রতিষ্ঠানের মালিকের কাছে বিদেশি নম্বর থেকে ফোন করে দুই কোটি টাকা এককালীন এবং মাসিক ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
‘বড় ক্রিকেটার না হলে বড়লোক হব’
গ্রেপ্তারের আগে এক গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ডেভিড ইমন বলেন, “আমার ছোটবেলা থেকে ইচ্ছা ছিল বড় ক্রিকেটার হব, না হয় বড়লোক হব। বড়লোক হওয়ার জন্য এই পথে আছি।”
চট্টগ্রাম জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (হাটহাজারী সার্কেল) কাজী মো. তারেক আজিজ বলেন, “লোকজনকে ফোনে ইমন এমনভাবে হুমকি দিতেন যে মানুষ সহজেই আতঙ্কিত হয়ে পড়ত। অস্ত্র ব্যবহারে তাঁর দক্ষতাও উদ্বেগজনক।”
ক্রিকেট মাঠ থেকে অপরাধজগতের শীর্ষে উঠে আসা ডেভিড ইমনের গল্প এখন চট্টগ্রামের জন্য এক সতর্কবার্তা। সম্ভাবনাময় একজন তরুণ কীভাবে সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে ভয়ংকর অপরাধীর পরিচয়ে পরিচিত হয়ে উঠলেন, সেটিই আজ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

