Saturday, October 17

মনছুর আলম মুন্না, স্টাফ রিপোর্টার, কক্সবাজার

কক্সবাজার ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা সদর হাসপাতালে প্রায় ২০ দিনের ব্যবধানে দুটি শিশু চুরির ঘটনা ঘটেছে। প্রথমে শিশু ওয়ার্ড থেকে সাত মাস বয়সী একটি শিশু এবং পরে নবজাতক ও বিশেষ পরিচর্যা ইউনিট (স্ক্যানু) থেকে আরেকটি নবজাতক চুরির ঘটনায় হাসপাতালের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

দুটি ঘটনায় এখন পর্যন্ত কাউকে শনাক্ত বা গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, পর্যাপ্ত নিরাপত্তাকর্মী ও পুলিশি সহায়তার অভাব রয়েছে। অন্যদিকে, পুলিশের বক্তব্য, হাসপাতালের সব জায়গায় পুলিশ মোতায়েন করা সম্ভব নয়। এ পরিস্থিতিতে রোগী ও তাঁদের স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।

শিশু ওয়ার্ড থেকে সাত মাসের শিশু নিখোঁজ

গত ১৯ সেপ্টেম্বর সকাল ১০টার দিকে হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ড থেকে রাকিব নামের সাত মাস বয়সী একটি শিশুকে নিয়ে যান অজ্ঞাতপরিচয় এক নারী। নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত ছেলেকে নিয়ে ১৫ সেপ্টেম্বর হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন তার বাবা মোহাম্মদ রুবেল হোসেন।

পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন ওই নারী নিজের তিন মাস বয়সী শিশুকে রুবেলের স্ত্রীর কাছে রেখে কান্নারত রাকিবকে কোলে নিয়ে শান্ত করার কথা বলেন। পরে তিনি শিশুটিকে নিয়ে সেখান থেকে চলে যান।

সিসিটিভি ফুটেজে ওই নারীকে অটোরিকশায় করে উখিয়ার সোনারপাড়ার দিকে যেতে দেখা যায় বলে জানা গেছে। তবে এরপর থেকে রাকিবের খোঁজ মেলেনি। এ ঘটনায় ২০ সেপ্টেম্বর সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়। ওই নারী ফেলে যাওয়া তিন মাস বয়সী শিশুটিকে চট্টগ্রামের রাউজাবাদের ছোটমণি নিবাসে পাঠানো হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

স্ক্যানু থেকেও নবজাতক চুরি

প্রথম ঘটনার প্রায় ২০ দিন পর, গত ৯ অক্টোবর রাত ১১টা ২৫ মিনিটের দিকে হাসপাতালের স্ক্যানু ওয়ার্ড থেকে আরেকটি নবজাতককে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে। বোরকা ও মাস্ক পরা এক নারী এ ঘটনা ঘটান বলে পরিবারের দাবি।

শিশুটির মা রোজিনা আক্তার জানান, স্ক্যানু ওয়ার্ডে প্রবেশের জন্য গেট পাস ও বিশেষ পোশাক প্রয়োজন। রাত ১১টা ১৭ মিনিটে শিশুকে দুধ খাওয়ানোর পর তিনি কক্ষে ফিরে যান। পরে রাত আড়াইটার দিকে শিশুকে খুঁজতে গিয়ে দেখেন, তাঁর সন্তান সেখানে নেই।

রোজিনার অভিযোগ, ওয়ার্ডের ভেতরে দায়িত্বে থাকা কারও সহযোগিতা ছাড়া নিয়ন্ত্রিত ওই ইউনিট থেকে এভাবে নবজাতক নিয়ে যাওয়া কঠিন।

সিসিটিভির বেশির ভাগ ক্যামেরা বিকল

শিশু চুরির ঘটনাগুলো তদন্ত করতে গিয়ে হাসপাতালের বেশির ভাগ সিসিটিভি ক্যামেরা বিকল অথবা সেগুলোর ফুটেজ অস্পষ্ট পাওয়া গেছে বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) রাজিব পাল জানান, স্ক্যানু থেকে নবজাতক নিয়ে যাওয়া নারীর মুখে মাস্ক ও বোরকা থাকায় ফুটেজ থেকে তাঁকে স্পষ্টভাবে শনাক্ত করা যাচ্ছে না।

হাসপাতাল ও পুলিশের বক্তব্যে ভিন্নতা

হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মং টিংঞো জানান, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ সুপারের কাছে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হলেও প্রয়োজনীয় পুলিশি সহায়তা পাওয়া যায়নি।

তবে কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অহিদুর রহমান এ দাবি নাকচ করে বলেন, হাসপাতালের পুলিশ বক্সে চার-পাঁচজন সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। হাসপাতালের প্রতিটি স্থানে পুলিশ মোতায়েন করা বাস্তবসম্মত নয়।

তিনি বলেন, সিসিটিভি ক্যামেরা, নার্স ও আয়ার উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও নিয়ন্ত্রিত স্ক্যানু ওয়ার্ড থেকে নবজাতক চুরির ঘটনা হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। আগে আনসার সদস্যরা দায়িত্ব পালন করলেও বাজেটসংকটের কারণে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাঁদের সরিয়ে দিয়েছে বলেও জানান তিনি।

তদন্ত কমিটি, তবু কাটেনি আতঙ্ক

পরপর দুটি ঘটনার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ রেসিডেন্ট ফিজিশিয়ান মিজানুর রহমানকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তবে সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণসহ বিভিন্ন জটিলতায় নির্ধারিত সময়ে প্রতিবেদন জমা দেওয়া সম্ভব হয়নি। রোববারের মধ্যে প্রতিবেদন চূড়ান্ত হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

এদিকে, দ্বিতীয় শিশু চুরির ঘটনার পর ১০ অক্টোবর ক্ষুব্ধ স্বজন ও স্থানীয় লোকজন হাসপাতালে ভাঙচুর ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বর্তমানে শিশু ওয়ার্ডের রোগী ও স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। রামুর মরিচ্যা এলাকা থেকে আসা এক রোগীর স্বজন তসলিমা আক্তার বলেন, ঘটনার পর নিরাপত্তা জোরদার করা হলেও ভয়ে রাতে কেউ ঠিকমতো ঘুমাতে পারছেন না।

Leave A Reply


Math Captcha
47 − 41 =