বাংলাদেশের ইলিশের জন্য প্রতিবছর দুর্গাপূজার আগে অপেক্ষায় থাকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বাজার। বাংলাদেশ থেকে ইলিশ রপ্তানির অনুমতি মিলবে কি না, তা নিয়ে পশ্চিমবঙ্গে তৈরি হয় ব্যাপক আগ্রহ। তবে এবার চিত্র পুরোপুরি ভিন্ন। দেশের বাজারের চাহিদা মেটাতে ভারত থেকেই ইলিশ আমদানি করতে হচ্ছে বাংলাদেশকে।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে ৩ লাখ ৫২ হাজার ৭৮৬ কেজি ইলিশ আমদানি হয়েছে। এর মধ্যে জুলাইয়ে এসেছে ২৯ হাজার ৪৪০ কেজি এবং আগস্টে ৩ লাখ ২৩ হাজার ৩৪৬ কেজি। আমদানি করা এসব ইলিশের ঘোষিত মূল্য প্রায় ৬ কোটি ৯৩ লাখ টাকা।
মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে উৎপাদিত মোট ইলিশের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ বাংলাদেশে উৎপাদিত হয়। দেশের নদনদী ও বঙ্গোপসাগর ইলিশের অন্যতম প্রধান বিচরণক্ষেত্র। অথচ সেই বাংলাদেশের বাজারেই এখন বাড়ছে ভারতীয় ইলিশের সরবরাহ।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশে ইলিশের জোগান কমে যাওয়ায় বাজারের চাহিদা পূরণে আমদানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকা ও হিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত দুই মাসে ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রায় ৫০০ টন ইলিশ রপ্তানি হয়েছে। হাওড়া পাইকারি ফিশ ইম্পোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক সৈয়দ আনোয়ার মকসুদের বরাত দিয়ে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, বাংলাদেশে ইলিশের ঘাটতি থাকায় এবার প্রথমবারের মতো হাওড়া বাজার থেকেও বাংলাদেশে ইলিশ রপ্তানি হয়েছে। সাধারণত হাওড়া থেকে বাংলাদেশে রুই, পারসে ও ট্যাংরাসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ যায়।
গুজরাট থেকেও এবার উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ইলিশ বাংলাদেশে আসছে। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, সেখানে ইলিশের সরবরাহ ভালো থাকায় তুলনামূলক কম দামে মাছ পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে ডিমওয়ালা ইলিশের চাহিদা থাকায় এসব মাছ বাংলাদেশে পাঠানো হচ্ছে। চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলে ইলিশের ডিম আলাদা করে বিক্রি করা হচ্ছে এবং কিছু মাছ নোনা ইলিশ হিসেবেও বাজারজাত করা হচ্ছে। আরও ১০০ থেকে ১৫০ টন ইলিশ বাংলাদেশে পাঠানোর বিষয়ে আলোচনা চলছে বলে ভারতীয় ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
বেনাপোল স্থলবন্দর ফিশারিজ কোয়ারেন্টাইন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই ও আগস্টে মোট ২২টি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ভারত থেকে ইলিশ আমদানি করেছে। জুলাইয়ে তিনটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ২৯ হাজার ৪৪০ কেজি এবং আগস্টে ১৯টি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ৩ লাখ ২৩ হাজার ৩৪৬ কেজি ইলিশ এসেছে।
দুই মাসে আমদানি করা ইলিশের ঘোষিত মূল্য ৬ কোটি ৯২ লাখ ৯৪ হাজার ৫১০ টাকা। এর মধ্যে জুলাইয়ের আমদানি মূল্য ছিল ৩৫ লাখ ৪৮ হাজার ৭৯৬ টাকা এবং আগস্টে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬ কোটি ৫৭ লাখ ৪৫ হাজার ৭১৪ টাকা।
বেনাপোল স্থলবন্দর ফিশারিজ কোয়ারেন্টাইন কার্যালয়ের পরিদর্শক আশওয়াদুল আলম বলেন, প্রথম দুই মাসে ৩ লাখ ৫২ হাজার ৭৮৬ কেজি ইলিশ আমদানি হয়েছে। আমদানি করা মাছ পরীক্ষা করে কোয়ারেন্টাইন সনদ দেওয়া হয়েছে।
বেনাপোল স্থলবন্দরের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক রুহুল আমিন বলেন, জুলাইয়ে ২৯ হাজার ৪৪০ কেজি এবং আগস্টে ৩ লাখ ২৩ হাজার ৩৪৬ কেজি ভারতীয় ইলিশ এসেছে। কাস্টমসের ছাড়পত্র ও বন্দরের শুল্ক পরিশোধের পর আমদানিকারকরা বাংলাদেশি ট্রাকে করে এসব মাছ দেশের বিভিন্ন এলাকায় নিয়ে গেছেন।
কম দামে আমদানি করা ইলিশ, দেশি মাছের বাজারে চাপ
বেনাপোল ও যশোরের বড় বাজারসহ বিভিন্ন বাজারে এখন আমদানি করা ইলিশের সরবরাহ বেড়েছে। সরকারি কর্মকর্তারা এসব মাছের বড় অংশ ভারতীয় বলে জানালেও স্থানীয় কিছু ব্যবসায়ী এগুলোকে মিয়ানমারের ইলিশ বলে দাবি করছেন।
অন্যদিকে ক্রেতাদের অভিযোগ, ভারত বা মিয়ানমার থেকে আমদানি করা ইলিশকে পদ্মা, চাঁদপুর, বরিশাল কিংবা চট্টগ্রামের ইলিশ হিসেবে বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, ১ কেজি ২০০ থেকে ১ কেজি ৩০০ গ্রাম ওজনের দেশি ইলিশ বর্তমানে কেজিপ্রতি ৩ হাজার ৩০০ থেকে ৩ হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। একই ওজনের আমদানি করা ইলিশের দাম প্রায় ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা।
কম দামে বড় আকারের ইলিশ পাওয়ায় ক্রেতাদের একটি অংশ আমদানি করা মাছের দিকে ঝুঁকছেন। এতে দেশি ইলিশের ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বলে দাবি করেছেন তারা।
যশোর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মনিরুল মামুন বলেন, আমদানি করা মাছকে দেশি ইলিশ হিসেবে বিক্রি করার বিষয়টি মৎস্য আইনের আওতায় সরাসরি পড়ে না। ফলে এ বিষয়ে তাদের ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ নেই।
উৎপাদন কমার আশঙ্কা, সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা
বিশ্বে ইলিশ উৎপাদনে শীর্ষ অবস্থানে থাকা বাংলাদেশের বাজারে বিদেশি ইলিশের ওপর নির্ভরতা বাড়াকে সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
মৎস্য বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ আশরাফুল আলম বলেন, বাংলাদেশের নদীগুলোতে দূষণ ও নাব্য সংকট দীর্ঘদিনের। এর সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব যুক্ত হওয়ায় ইলিশের আবাসস্থল ও চলাচলের ওপর চাপ বাড়ছে।
তার মতে, দেশে ইলিশের উৎপাদন কমে গিয়ে বাজারের চাহিদা পূরণে যদি প্রতিবেশী দেশের ওপর নির্ভর করতে হয়, তাহলে তা বাংলাদেশের ইলিশের জন্য বড় ধরনের হুমকি।
