Friday, November 6

নিয়োগ, বদলি ও পদায়নে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগের পর এবার জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র ও সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচারের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগটি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) জমা পড়েছে।

দুদক জানিয়েছে, নিয়োগ-বাণিজ্য সংক্রান্ত আগের অভিযোগের সঙ্গে অর্থ পাচারের নতুন অভিযোগও অনুসন্ধানের আওতায় আনা হয়েছে।

দুদকের ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযোগে আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে দুবাইয়ে ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, সিঙ্গাপুরে ৩ হাজার কোটি টাকা, অস্ট্রেলিয়ায় ২ হাজার কোটি টাকা এবং সুইজারল্যান্ডে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পাচারের কথা বলা হয়েছে। এসব অর্থ দিয়ে বিদেশে বাড়ি কেনা ও বিনিয়োগের অভিযোগও রয়েছে।

তবে অভিযোগগুলোর সত্যতা এখনো প্রমাণিত হয়নি। আসিফ মাহমুদ শুরু থেকেই তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন।

অর্থ পাচারের অভিযোগের খবর প্রকাশের পর নিজের ফেসবুক পোস্টে কটাক্ষ করে আসিফ মাহমুদ লেখেন, ‘অনুসন্ধানে বিদেশে কিছু পেলে আমাকে শুধু ১০% দিয়েন, চলতে কষ্ট হচ্ছে।’

পরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি দুদকের এই পদক্ষেপকে হয়রানিমূলক বলে মন্তব্য করেন।

উপদেষ্টা থেকে রাজনীতিতে

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারে উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেন। শুরুতে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। পরে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও পান।

২০২৫ সালের ১০ ডিসেম্বর সংসদ নির্বাচনের আগে উপদেষ্টার পদ ছাড়েন আসিফ মাহমুদ। এরপর এনসিপিতে যোগ দিয়ে সক্রিয় রাজনীতিতে নামেন। বর্তমানে তিনি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র প্রার্থী হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

এর মধ্যেই তাঁর বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ নিয়ে অনুসন্ধানে নেমেছে দুদক।

নিয়োগ ও পদায়নে কোটি কোটি টাকার অভিযোগ

গত ২ সেপ্টেম্বর যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ ও পদোন্নতি-বাণিজ্যের অভিযোগে আসিফ মাহমুদসহ চারজনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। এ জন্য চার সদস্যের একটি অনুসন্ধান দল গঠন করা হয়।

এরপর গত ৯ সেপ্টেম্বর সংবাদ সম্মেলনে আসিফ মাহমুদ অভিযোগ করেন, তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অনুসন্ধানের নামে মূলত চরিত্রহননের চেষ্টা করা হচ্ছে।

নতুন অর্থ পাচারের অভিযোগের বিষয়ে দুদক জানিয়েছে, চলমান অনুসন্ধানের সঙ্গে এই অভিযোগও যুক্ত করা হবে।

১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ

দুদকে জমা পড়া অভিযোগে বলা হয়েছে, দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ দিয়ে আসিফ মাহমুদ বিদেশে সম্পদ গড়েছেন এবং বিনিয়োগ করেছেন।

অভিযোগ অনুযায়ী, দুবাইয়ে ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, সিঙ্গাপুরে ৩ হাজার কোটি টাকা, অস্ট্রেলিয়ায় ২ হাজার কোটি টাকা এবং সুইজারল্যান্ডে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পাচার করা হয়েছে। দুই ভগ্নিপতি ও এক ভাগ্নের মাধ্যমে বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগও করা হয়েছে।

অভিযোগে তাঁর বিলাসবহুল জীবনযাপনের প্রসঙ্গও তুলে ধরা হয়েছে। নিয়মিত হেলিকপ্টারে ভ্রমণ ও পাঁচ তারকা হোটেলে অবস্থানের বিষয়টিও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে দুদকের অনুসন্ধান এখনো চলমান।

নিয়োগ ও পদায়নে ঘুষের অভিযোগ

দুদকে জমা পড়া অভিযোগের একটি অংশে বলা হয়েছে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগের পর প্রায় ৬০ কোটি টাকা এবং দেশের বিভিন্ন জেলায় ৩৬ জন জেলা প্রশাসক পদায়নে ২ কোটি থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়েছে।

এ ছাড়া ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের টেন্ডার-বাণিজ্য এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডার থেকে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ কমিশন নেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে।

উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ

নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের টেন্ডার-বাণিজ্যের সঙ্গেও আসিফ মাহমুদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে দুদকে জমা দেওয়া অভিযোগে।

এ ছাড়া স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন ও সেতু নির্মাণ প্রকল্পে ব্যয় বাড়িয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগও করা হয়েছে।

অভিযোগের মধ্যে ঢাকা ওয়াসার সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্পের তৃতীয় ধাপে অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধি এবং শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম প্রকল্পে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয় বাড়িয়ে অর্থ আত্মসাতের বিষয়ও উল্লেখ করা হয়েছে।

যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে কোটি কোটি টাকা লেনদেন এবং ঘুষের বিনিময়ে এলজিইডির সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুর রশীদ খান ও গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল লতিফ খানকে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে আসিফ মাহমুদের নিজ এলাকা কুমিল্লার মুরাদনগরে বরাদ্দ ৪৫০ কোটি টাকা থেকে প্রভাব খাটিয়ে অর্থ নেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া তাঁর বাবা মাহমুদুল আলম ভূঁইয়ার বিরুদ্ধেও ঘুষ লেনদেনে তদবির ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ করা হয়েছে।

‘তারা দিতে থাকুক, আমরা প্রস্তুত’

ঢাকা মহানগর দক্ষিণ এনসিপির সদস্য সংগ্রহ কার্যক্রম নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকরা অর্থ পাচারের অভিযোগের বিষয়ে আসিফ মাহমুদের প্রতিক্রিয়া জানতে চান।

জবাবে তিনি অভিযোগে উল্লেখ করা অর্থের অঙ্ক নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁর ভাষ্য, কখনো ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা, কখনো ১১ হাজার কোটি টাকা, আবার এর আগে ২ কোটি ৭৬ লাখ টাকার অভিযোগের কথা শুনেছেন।

আসিফ মাহমুদ বলেন, এসব অভিযোগকে তিনি তাঁকে হয়রানি করার একটি প্রক্রিয়া হিসেবে দেখছেন। তাঁর দাবি, সরকার কাউকে হয়রানি করতে চাইলে বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করতে পারে, যার নজির তিনি আগেও দেখেছেন।

দুদকের কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের দুর্নীতি নিয়ে দুদকের তেমন কোনো তৎপরতা নেই। তাঁর বিরুদ্ধে আগের অনুসন্ধানে কোনো ফল না পাওয়ায় নতুন অভিযোগ আনা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

শেষে আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘তারা দিতে থাকুক, আমরা প্রস্তুত আছি।’

দুদকের অনুসন্ধান শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযোগগুলোর সত্যতা বা আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়। অনুসন্ধানে অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ পাওয়া যায় কি না, এখন সেটিই দেখার বিষয়।

Leave A Reply


Math Captcha
74 − 67 =