Thursday, July 16

বোস্টনে মরক্কোর বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে কিলিয়ান এমবাপ্পের পেনাল্টি মিস শেষ পর্যন্ত ফ্রান্সের জয়যাত্রায় কোনো প্রভাব ফেলেনি। ২-০ গোলের জয়ে সেমিফাইনাল নিশ্চিত করেছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। তবে ম্যাচের ফলের আড়ালে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে এমবাপ্পের সেই পেনাল্টি এবং আধুনিক ফুটবলে বহুল ব্যবহৃত ‘থমকে’ শট নেওয়ার কৌশল।

বিশ্বকাপের ইতিহাস বলছে, ফ্রান্সের ফুটবলারদের পেনাল্টি মিস বিরল ঘটনা। ২০১৪ বিশ্বকাপে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে করিম বেনজেমার পর এবার সেই তালিকায় যোগ হলো কিলিয়ান এমবাপ্পের নাম।

পেনাল্টি নেওয়ার সময় দৌড়ে এসে শেষ মুহূর্তে গতি কমিয়ে গোলরক্ষককে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেন এমবাপ্পে। কিন্তু মরক্কোর গোলরক্ষক ইয়াসিন বুনু ধৈর্য ধরে নিজের অবস্থান ধরে রেখে বাঁ দিকে ঝাঁপিয়ে সহজেই ঠেকিয়ে দেন শটটি। নেইমারসহ বিশ্বের অনেক তারকা এই কৌশলে বহুবার সফল হলেও এবার সেটি ফরাসি অধিনায়কের জন্য বুমেরাং হয়ে দাঁড়ায়।

ফিফার বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, বলে কিক করার ঠিক আগমুহূর্ত ছাড়া খেলোয়াড় দৌড়ের সময় গতি কমাতে বা ছন্দ পরিবর্তন করতে পারেন। অতীতে পেলে, জন অলড্রিজ ও হুগো সানচেজও এই কৌশল ব্যবহার করেছেন। তবে গোলরক্ষক যদি আগেভাগে ঝাঁপিয়ে না পড়ে স্থির থাকেন, তাহলে এই পদ্ধতি শট নেওয়া খেলোয়াড়ের বিপক্ষেও যেতে পারে।

চলতি বিশ্বকাপে এমবাপ্পে একাই নন, একই কৌশল ব্যবহার করে পেনাল্টি মিস করেছেন লিওনেল মেসি, হ্যারি কেইন, ব্রুনো গিমারাইস ও জর্গেন স্ট্র্যান্ড লারসেনও। অবশ্য ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে দ্বিতীয়বার পেনাল্টির সুযোগ পেয়ে হ্যারি কেইন আর থামেননি; স্বাভাবিকভাবে শট নিয়ে গোল করেন।

বিবিসির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এবারের বিশ্বকাপে টাইব্রেকারসহ ‘থমকে’ নেওয়া হয়েছে মোট ২৬টি পেনাল্টি। এর মধ্যে ১১টি থেকেই গোল আসেনি। অর্থাৎ এই কৌশলে সফলতার হার মাত্র ৫৭ শতাংশ।

অন্যদিকে স্বাভাবিক গতিতে দৌড়ে নেওয়া ৩৫টি পেনাল্টির মধ্যে ২৪টিতেই গোল হয়েছে। অর্থাৎ প্রচলিত কৌশলে সফলতার হার প্রায় ৬৮ শতাংশ, যা ‘স্টাটার রান-আপ’ কৌশলের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

আর্সেনালের সাবেক তারকা ইয়ান রাইট মনে করেন, গোলরক্ষকেরা এখন এই কৌশলের রহস্য বুঝে ফেলেছেন। তাঁর ভাষায়, “মনে হচ্ছে গোলরক্ষকেরা এখন এই ধরনের শটের গতিপ্রকৃতি ভালোভাবেই বুঝতে পারছেন।”

অবশ্য পাল্টা যুক্তিও রয়েছে। নেইমার, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, কাই হাভার্টজ, মার্কো আরনাউতোভিচ এবং এমবাপ্পে নিজেও একই কৌশলে এবারের বিশ্বকাপে পেনাল্টি থেকে গোল করেছেন।

তবে সামগ্রিকভাবে এবারের বিশ্বকাপে পেনাল্টি থেকে গোল করার হারই আশানুরূপ নয়। টাইব্রেকার বাদ দিলে পেনাল্টি মিসের হার প্রায় ৩০ শতাংশ, যা ১৯৬৬ সালের পর বিশ্বকাপ ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। আর টাইব্রেকার যুক্ত করলে মিসের হার বেড়ে দাঁড়ায় ৩৫ শতাংশ, যা বিশ্বকাপ ইতিহাসে সর্বোচ্চ।

এমবাপ্পের জন্য বিষয়টি আরও কঠিন হয়ে ওঠে প্রতিপক্ষের গোলরক্ষক ইয়াসিন বুনুর কারণে। বিশ্বকাপে টাইব্রেকারসহ মোট ৯টি পেনাল্টির মুখোমুখি হয়ে মাত্র দুটি গোল হজম করেছেন মরক্কোর এই গোলরক্ষক। চারটি শট নিজেই সেভ করেছেন, দুটি পোস্টে লেগেছে এবং একটি বাইরে গেছে। এই কীর্তিতে তিনি টনি শুমাখার, সের্হিও গোয়কোচিয়া, ইকার ক্যাসিয়াস ও ডমিনিক লিভাকোভিচের সঙ্গে যৌথভাবে বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ পেনাল্টি সেভ করা গোলরক্ষকদের কাতারে জায়গা করে নিয়েছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, এমবাপ্পের পেনাল্টি মিসের পেছনে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল দীর্ঘ অপেক্ষা। ভিএআরের পর্যালোচনার কারণে পেনাল্টির সিদ্ধান্ত হওয়ার পর শট নিতে তাঁকে প্রায় ৩ মিনিট ১২ সেকেন্ড অপেক্ষা করতে হয়।

আয়ারল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক রয় কিন বলেন, “তিন মিনিটের বেশি সময় অপেক্ষা করতে বাধ্য করাটা স্ট্রাইকারের জন্য কঠিন। এমন পরিস্থিতিতে সময়ই সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠে। এতে গোলরক্ষকই বেশি সুবিধা পায়।”

ম্যাচ শেষে এমবাপ্পেও স্বীকার করেন, বারবার ভিএআর পর্যালোচনার কারণে তাঁর মনোযোগ নষ্ট হয়েছিল।

তিনি বলেন, “আমি শট নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। তখন রেফারি বললেন, এটা পেনাল্টি নয়। পরে আবার সিদ্ধান্ত বদলে বললেন, পেনাল্টি। এরপর আবার আগের একটি মুহূর্ত রিভিউ করতে হলো। এতবার থামতে হওয়ায় শেষ পর্যন্ত মনোযোগ হারিয়ে ফেলেছিলাম।”

ইয়ান রাইটের মতে, পেনাল্টি নেওয়ার আগে যত বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয়, নিজের সিদ্ধান্ত নিয়েই তত বেশি সংশয় তৈরি হয়। আর সেই মানসিক চাপই অনেক সময় একটি ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে পারে।

Leave A Reply


Math Captcha
78 − = 74