চট্টগ্রামের আনোয়ারায় প্রতীক্ষিত বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক অঞ্চল (চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন) বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে দেশের অন্যতম বৃহৎ বিদেশি বিনিয়োগভিত্তিক শিল্পাঞ্চলের যাত্রা শুরু হতে যাচ্ছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে অন্তত এক লাখ মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সোমবার (২৭ জুলাই) প্রকল্পটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মাধ্যমে এক দশকের বেশি সময় ধরে স্থবির হয়ে থাকা এ শিল্পাঞ্চলের নির্মাণকাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হচ্ছে।
বাংলাদেশ ও চীন ২০১৪ সালে এ প্রকল্প বাস্তবায়নে সমঝোতা স্মারক সই করে। ২০১৬ সালে জমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হলেও ডেভেলপার নিয়োগ, অর্থায়ন ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে দীর্ঘদিন কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের পর প্রকল্পটিতে নতুন গতি আসে। সফরের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) এবং চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশনের (সিআরবিসি) মধ্যে ডেভেলপার চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
এর আগে গত ১৬ জুন জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটির অনুমোদন দেওয়া হয়।
কর্ণফুলী নদীর মোহনায় চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার বেলচূড়া এলাকায় প্রায় ৮০০ একর জমির ওপর সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) ভিত্তিতে এ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা হবে। কর্ণফুলী টানেল, চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর এবং শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিকটবর্তী হওয়ায় অঞ্চলটি দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প হাবে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
প্রকল্পটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন এবং বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুনসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত থাকবেন।
প্রকল্পটির অবকাঠামো উন্নয়নে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ হাজার ১৮৯ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ১ হাজার ৭২২ কোটি টাকা এবং চীনের এক্সিম ব্যাংকের ঋণ থেকে আসবে ২ হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা। প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২০৩১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত।
এই অর্থনৈতিক অঞ্চলে নির্মাণ করা হবে—
- ১ হাজার ২৩৫ মিটার দীর্ঘ জেটি লিংক সড়ক।
- ১ হাজার ১৮১ মিটার দীর্ঘ প্রধান সড়ক।
- ২০ হাজার ৩০৪ ঘনমিটার ধারণক্ষমতার পানি সংরক্ষণাগার।
- ৪.২৪ এমএমসিএফডি ক্ষমতাসম্পন্ন গ্যাস ট্রান্সমিশন লাইন ও ডিস্ট্রিক্ট রেগুলেটিং স্টেশন।
- ২৫ এমএলডি ক্ষমতাসম্পন্ন সেন্ট্রাল ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট।
- ২০ হাজার ডেডওয়েট টন ধারণক্ষমতার বহুমুখী জেটি।
- দৈনিক ৬০ টন সক্ষমতার বর্জ্য সংগ্রহ কেন্দ্র।
- প্রায় ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ বাউন্ডারি ওয়াল।
- দুটি ৩৩/১১ কেভি বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র।
বেজার তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণের সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে কেমিক্যাল, অটোমোবাইল অ্যাসেম্বলি, গার্মেন্টস, ওষুধশিল্পসহ বিভিন্ন উৎপাদনমুখী আধুনিক শিল্প ও লজিস্টিক হাব গড়ে উঠবে।
চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (সিসিসিআই) সভাপতি আমিরুল হক বলেছেন, চীনা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বিশেষায়িত এই অর্থনৈতিক অঞ্চল বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক অংশীদারত্বকে আরও শক্তিশালী করবে। তাঁর মতে, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সম্প্রসারণ এবং অধিক বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

