Monday, October 19

ভোরের আলো ফোটার আগেই বেজে ওঠে ঢাক। ধূপের গন্ধ, শঙ্খধ্বনি ও মন্ত্রোচ্চারণে মুখর হয়ে ওঠে রাজধানীর ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির। নবপত্রিকা বা কলাবউয়ের স্নান, দেবী প্রতিমার পাশে নবপত্রিকা স্থাপন, পূজা-অর্চনা ও পুষ্পাঞ্জলির মধ্য দিয়ে শনিবার পালিত হয়েছে শারদীয় দুর্গোৎসবের মহাসপ্তমী। এদিন দেবী দুর্গার কাছে অশুভ শক্তির বিনাশ, দেশ ও জাতির মঙ্গল এবং সব ধর্মের মানুষের মধ্যে শান্তি-সম্প্রীতি বজায় থাকার প্রার্থনা করেন ভক্তরা।

শনিবার সকালে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে ভক্ত ও দর্শনার্থীদের উপস্থিতিতে উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। নানা বয়সী মানুষ পূজার আনুষ্ঠানিকতা দেখতে মন্দিরে আসেন। দিনভর পূজা-অর্চনা, পুষ্পাঞ্জলি ও প্রার্থনায় অংশ নেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা।

নবপত্রিকার মহাস্নান

মহাসপ্তমীর অন্যতম প্রধান আচার নবপত্রিকা স্নান, যা প্রচলিতভাবে কলাবউ স্নান নামে পরিচিত। শাস্ত্রীয় বিধি অনুযায়ী কলা, কচু, হলুদ, জয়ন্তী, বেল, ডালিম, অশোক, মানকচু ও ধানগাছ একত্র করে নবপত্রিকা তৈরি করা হয়। পরে একজোড়া বেলসহ শ্বেত অপরাজিতা লতা দিয়ে এগুলো বেঁধে লালপাড় সাদা শাড়ি পরিয়ে বধূরূপ দেওয়া হয়।

সকালে ঢাকেশ্বরী মন্দিরের পুরোহিত ও ভক্তদের একটি দল নবপত্রিকা মাথায় নিয়ে পাশের জলাশয়ে যান। সেখানে মন্ত্রোচ্চারণ ও জয়ধ্বনির মধ্য দিয়ে কলাবউয়ের মহাস্নান সম্পন্ন হয়। স্নান শেষে নবপত্রিকাকে মন্দিরে ফিরিয়ে এনে দেবী প্রতিমার ডান পাশে স্থাপন করা হয়।

সকাল ৭টা ৩৯ মিনিটে নবপত্রিকা স্থাপন সম্পন্ন হওয়ার পর কল্পারম্ভ ও বিহিত পূজার মধ্য দিয়ে শুরু হয় পরবর্তী আনুষ্ঠানিকতা। পূজার বিভিন্ন পর্বে দেবীর উদ্দেশে পুষ্পার্ঘ্য নিবেদন, ভোগ ও আরতি অনুষ্ঠিত হয়। সকালে পূজা শেষে ফুল ও বেলপাতা দিয়ে দেবীর চরণে পুষ্পাঞ্জলি দেন ভক্তরা। অন্নভোগ, লুচি, মিষ্টি ও ফলসহ বিভিন্ন উপকরণ দেবীর উদ্দেশে নিবেদন করা হয়।

শান্তি ও সম্প্রীতির প্রার্থনা

মহানগর পূজা কমিটির উপদেষ্টা মনীন্দ্র কুমার নাথ বলেন, মহাসপ্তমীতে ভক্তরা মণ্ডপে এসে অঞ্জলি দিয়ে মায়ের চরণে নিজেদের আকুতি জানাচ্ছেন। দুর্গোৎসবের মধ্য দিয়ে সুন্দর, সমৃদ্ধ ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ার বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার প্রত্যাশা করেন তিনি।

ঢাকা মহানগর পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি গোপাল চন্দ্র দেবনাথ বলেন, সকালে পূজা শুরু হয়ে পৌনে ১০টার দিকে অঞ্জলি দেওয়া হয়। অঞ্জলি শেষে দেশ ও বিশ্বের মানুষের মধ্যে শান্তি, সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য বজায় থাকা এবং সব ধরনের হানাহানি বন্ধের জন্য প্রার্থনা করা হয়।

মন্দির ঘিরে উৎসবের আমেজ

মহাসপ্তমী ঘিরে ঢাকেশ্বরী মন্দির চত্বর ও আশপাশের সড়ক বর্ণিল আলো ও নানা রঙের তোরণে সাজানো হয়। মন্দিরের বাইরের প্রাঙ্গণে বসে রকমারি মেলা। শাঁখা, সিঁদুর, পূজার সামগ্রী, শিশুদের খেলনা, খাজা-গজা ও বাতাসাসহ নানা পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেন দোকানিরা। তবে সকালে দোকানগুলোতে ক্রেতার উপস্থিতি ছিল তুলনামূলক কম।

ভক্ত ও দর্শনার্থীদের নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করতে মন্দির এলাকায় নেওয়া হয় বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের পাশাপাশি দায়িত্ব পালন করেন স্বেচ্ছাসেবকেরাও।

উত্তরা থেকে পরিবার নিয়ে মন্দিরে আসা পারমিতা দেবনাথ বলেন, সকালে এসে কলাবউ স্নান দেখেছেন। ঢাকের শব্দ ও ধূপের গন্ধে তাঁর মন ভরে গেছে। সবার শান্তি ও সুস্থতার জন্য দেবীর কাছে প্রার্থনা করেন তিনি।

ছয় দিন ধরে চলবে এবারের আনুষ্ঠানিকতা

হিন্দু ধর্মীয় আচার অনুযায়ী, মহালয়া, বোধন ও সন্ধিপূজা দুর্গোৎসবের গুরুত্বপূর্ণ পর্ব। আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত দুর্গাপূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা চলে। তবে এবার মহাসপ্তমী তিথি শনিবার ও রোববার দুদিন বিস্তৃত হওয়ায় উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা ছয় দিন ধরে চলবে।

সোমবার অষ্টমী, মঙ্গলবার নবমী এবং বুধবার দশমীর সন্ধ্যায় প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এ বছরের শারদীয় দুর্গোৎসব। পরে কোজাগরী পূর্ণিমায় লক্ষ্মীপূজার মধ্য দিয়ে দেবীপক্ষের সমাপ্তি ঘটবে।

শাস্ত্রীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এবার দেবী দুর্গার আগমন ঘোটকে বা ঘোড়ায় এবং গমন নৌকায়। প্রচলিত বিশ্বাসে ঘোড়ায় আগমনকে অস্থিতিশীলতা ও যুদ্ধের আশঙ্কার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হয়। অন্যদিকে, নৌকায় গমনকে শুভ মনে করা হয়; যা বন্যা বা শস্যবৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয় বলে বিশ্বাস করা হয়।

বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর সারা দেশে ৩৩ হাজার ৮৫১টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ৩৩ হাজার ৩৫৫টি। সে হিসাবে এবার মণ্ডপের সংখ্যা বেড়েছে ৪৯৬টি।

অন্যদিকে, ঢাকা মহানগরীতে এবার ২৫৮টি মণ্ডপে পূজার আয়োজন করা হয়েছে। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ২৬১টি। সড়কে পূজার আয়োজনের অনুমতি না পাওয়ায় এবার ঢাকা মহানগরীতে মণ্ডপের সংখ্যা তিনটি কমেছে।

Leave A Reply


Math Captcha
36 − = 28