Saturday, October 10

কক্সবাজার প্রতিনিধি

জীবিকার সন্ধান, উন্নত জীবনের স্বপ্ন কিংবা বিয়ের প্রলোভন—নানা কারণে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার চেষ্টা করছেন বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গারা। আর এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে কক্সবাজারের উপকূলীয় এলাকায় মানব পাচারকারী চক্র আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। টেকনাফ ও উখিয়াসহ জেলার বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকায় দালালদের তৎপরতার কথা জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

অভিযোগ রয়েছে, কাজের প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশি তরুণদের এবং বিয়ের আশ্বাস দিয়ে রোহিঙ্গা নারী ও কিশোরীদের পাচারের ফাঁদে ফেলা হচ্ছে। কেউ জীবিকার আশায় সমুদ্রযাত্রায় বেরিয়ে পড়ছেন, আবার কেউ মালয়েশিয়ায় পৌঁছানোর পর জিম্মি, নির্যাতন ও মুক্তিপণ আদায়ের শিকার হচ্ছেন। নিখোঁজ স্বজনের অপেক্ষায় বছরের পর বছর কাটছে অনেক পরিবারের।

সাম্প্রতিক সময়ে উদ্ধার ৬৫ জন

সর্বশেষ গত ৩০ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাতে সেন্টমার্টিন ও আশপাশের সমুদ্র এলাকায় টহলের সময় নৌবাহিনীর জাহাজ বানৌজা খালিদ বিন ওয়ালিদ ১৬ জন রোহিঙ্গা ও ৪৯ জন বাংলাদেশিকে উদ্ধার করে। উদ্ধার ব্যক্তিদের মধ্যে চারজন রোহিঙ্গা নারী ছিলেন। এ ঘটনায় আটজন রোহিঙ্গা ও তিনজন বাংলাদেশিসহ মোট ১১ জনকে আটক করা হয়।

এর আগে ১৫ সেপ্টেম্বর রাতে টেকনাফের বাহারছড়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে নারী-পুরুষসহ ১৮ জনকে উদ্ধার করে পুলিশ ও কোস্টগার্ড। তাঁদের মধ্যে দুজন রোহিঙ্গা ও ১৬ জন বাংলাদেশি। পুলিশের ভাষ্য, মালয়েশিয়ায় যাওয়ার উদ্দেশ্যে তাঁদের ওই এলাকায় জড়ো করা হয়েছিল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতির খবর পেয়ে পাচারকারীরা পালিয়ে যায়।

সাম্প্রতিক এসব ঘটনায় উপকূলীয় এলাকায় লোকজন জড়ো করে সমুদ্রপথে পাঠানোর প্রস্তুতির অভিযোগ সামনে এসেছে।

ছোট নৌকা থেকে বড় ট্রলারে

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সম্ভাব্য যাত্রীদের সাধারণত এক জায়গায় জড়ো না করে রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির ও স্থানীয় গ্রাম থেকে ছোট ছোট দলে সংগ্রহ করা হয়। পরে তাঁদের টেকনাফের দুর্গম উপকূলীয় এলাকায় নেওয়া হয়।

অভিযোগ রয়েছে, রাতের আঁধারে ছোট মাছ ধরার নৌকায় করে তাঁদের গভীর সমুদ্রে অপেক্ষমাণ বড় ট্রলারে তুলে দেওয়া হয়। এ ধরনের তৎপরতার সঙ্গে টেকনাফের বাহারছড়ার কচ্ছপিয়া, মারিশবনিয়া ও নোয়াখালীপাড়া এবং উখিয়ার জালিয়াপালং, মনখালী ও ইনানী এলাকার নাম জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

পাচারকারীদের লক্ষ্য শুধু বাংলাদেশি তরুণেরা নন; রোহিঙ্গা নারী-পুরুষেরাও এ চক্রের ফাঁদে পড়ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে রোহিঙ্গা নারী ও কিশোরীদের বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে পাচারের অভিযোগ উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

মালয়েশিয়ায় পৌঁছেই বদলে যায় পরিস্থিতি

পাচারের শিকার ব্যক্তিদের স্বজনদের অভিযোগ, মালয়েশিয়ায় পৌঁছানোর পর অনেকের পরিস্থিতি পাল্টে যায়। তাঁদের কাউকে কাউকে জিম্মি করে পরিবারের কাছে মুক্তিপণ দাবি করা হয়। টাকা না পেলে নির্যাতনের শিকার হতে হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।

রামুর খুনিয়াপালং এলাকার তরুণ কাজলের পরিবারের অভিযোগ, কাজলসহ তিন তরুণকে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর পর একটি চক্র তাঁদের আটক করে। প্রত্যেকের পরিবারের কাছে পাঁচ লাখ টাকা করে দাবি করা হয়। পরিবারের সদস্যরা গবাদিপশু বিক্রি, জমি বন্ধক রাখা ও চাঁদা তুলে চার লাখ টাকার বেশি সংগ্রহ করে স্থানীয় এক দালালের হাতে দেন।

পরিবারের দাবি, ওই টাকা নির্যাতনকারীদের কাছে পৌঁছায়নি। পরে নির্যাতনের একপর্যায়ে কাজল মারা যান। তাঁর এক সহযাত্রী মালয়েশিয়ার কারাগারে রয়েছেন এবং অন্যজন দেশে ফেরার চেষ্টা করছেন বলে জানিয়েছে পরিবার।

কাজলের মা বলেন, ‘আমার ছেলের হত্যার বিচার চাই। আমার সব শেষ হয়ে গেছে।’

অন্যদিকে, টেকনাফের বাহারছড়ার ৮০ বছর বয়সী ছুরা খাতুনের অপেক্ষা চলছে ১৫ বছর ধরে। তাঁর ছেলে আলী এক দালালের মাধ্যমে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার পর আর ফেরেননি। স্ত্রী ও তিন সন্তান রেখে জীবিকার সন্ধানে দেশ ছেড়েছিলেন তিনি। এরপর তাঁর ভাগ্যে কী ঘটেছে, তা আজও জানতে পারেনি পরিবার।

বিয়ের প্রলোভনে রোহিঙ্গা নারী পাচারের অভিযোগ

রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের কয়েকজন মাঝির ভাষ্য, মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত রোহিঙ্গা পুরুষদের বিয়ের জন্য নারী খোঁজার প্রবণতাকে কাজে লাগাচ্ছে পাচারকারীরা। এ উদ্দেশ্যে আশ্রয়শিবিরে গিয়ে নারীদের বিয়ের প্রস্তাব দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয় সূত্রের দাবি, কোনো পরিবার রাজি হলে কয়েক দফা যোগাযোগের পর যাত্রার দিনক্ষণ ঠিক করা হয়। পরে নারী ও কিশোরীদের ছোট দলে উপকূলীয় এলাকায় এনে নৌকায় তুলে দেওয়া হয়। তবে বিয়ের প্রস্তাবের আড়ালে কতজন নারী ও কিশোরী পাচারের শিকার হয়েছেন, তার নির্ভরযোগ্য সরকারি পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি।

১৫ বছরেও নিখোঁজদের পূর্ণাঙ্গ হিসাব নেই

সমুদ্রপথে মালয়েশিয়ায় মানব পাচারের ঘটনা নতুন নয়। ২০১১ সাল থেকেই এ পথে মানুষের যাত্রার খবর প্রকাশিত হয়ে আসছে। ২০১৫ সালে থাইল্যান্ডের সীমান্তবর্তী জঙ্গলে পাচারকারীদের ক্যাম্প ও গণকবরের সন্ধান পাওয়ার পর বাংলাদেশসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই পথে মানব পাচারের ভয়াবহতা আন্তর্জাতিকভাবে আলোচনায় আসে।

পরবর্তী সময়ে থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় পাচারবিরোধী অভিযান জোরদার হলে কিছু সময়ের জন্য এ পথে তৎপরতা কমে আসে। তবে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় নেওয়ার পর কক্সবাজার উপকূলকে কেন্দ্র করে পাচারচক্র আবারও সক্রিয় হওয়ার অভিযোগ ওঠে।

সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, বর্ষা শেষে সমুদ্র তুলনামূলক শান্ত হলে সমুদ্রপথে যাত্রার প্রবণতা বাড়তে পারে। তবে নিখোঁজ মানুষের প্রকৃত সংখ্যা এবং পাচারের শিকার ব্যক্তিদের পূর্ণাঙ্গ হিসাব এখনো স্পষ্ট নয়।

গ্রেপ্তার হলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে মূল হোতারা?

স্থানীয়দের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালিয়ে পাচারের শিকার ব্যক্তিদের উদ্ধার করলেও চক্রের মূল সংগঠকদের শনাক্ত ও বিচারের আওতায় আনা কঠিন হচ্ছে। গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের কেউ কেউ জামিনে বেরিয়ে আবার একই অপরাধে জড়াচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

টেকনাফ-২ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. হানিফুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির থেকে বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে রোহিঙ্গাদের সমুদ্রপথে মালয়েশিয়ায় পাচারের চেষ্টা করছে দালাল চক্র। সীমান্ত ও উপকূলীয় এলাকায় বিজিবির নজরদারি ও অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, মানব পাচার ও অপহরণের বিরুদ্ধে পুলিশ সতর্ক রয়েছে এবং নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে।

ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন অ্যান্ড ইয়ুথ প্ল্যাটফর্ম) শরিফুল ইসলাম হাসান বলেন, সমুদ্রপথে মানব পাচার দেশের ভাবমূর্তি ও বৈধ শ্রমবাজার—দুই ক্ষেত্রেই ক্ষতি করছে।

তাঁর মতে, শুধু পাচারের শিকার ব্যক্তিদের উদ্ধার করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। দেশে ও বিদেশে থাকা পাচারচক্রের মূল হোতাদের শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া এবং তাঁদের অবৈধ সম্পদ জব্দ করার উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো প্রয়োজন।

ভাঙতে হবে পাচারের পুরো নেটওয়ার্ক

সমুদ্রপথে মানব পাচার বন্ধে শুধু উপকূলীয় এলাকায় নজরদারি বাড়ানো যথেষ্ট নয়। পাচারের সঙ্গে জড়িত দালাল, অর্থদাতা, নৌযান নিয়ন্ত্রণকারী এবং দেশের বাইরে অবস্থানরত চক্রের সদস্যদের শনাক্ত করাও জরুরি।

জীবিকার সন্ধানে বেরিয়ে কেউ যেন মাঝসমুদ্রে অনিশ্চিত জীবনের মুখে না পড়েন, জিম্মি ও নির্যাতনের শিকার না হন কিংবা বছরের পর বছর নিখোঁজ না থাকেন—সে জন্য পাচারের পুরো নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়ার পাশাপাশি নিরাপদ অভিবাসনের সুযোগ বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংবাদ প্রেরক:
মনছুর আলম মুন্না
স্টাফ রিপোর্টার, কক্সবাজার

Leave A Reply


Math Captcha
79 + = 80