Friday, November 6

ইয়েমেনে কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ আরও বাড়িয়ে নিচ্ছে হুতিরা। শুক্রবার পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশটির লোহিত সাগর উপকূলের বড় অংশ এখন তাদের নিয়ন্ত্রণে। গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোখা দখলের পর কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে হুতিদের প্রভাব আরও শক্ত হয়েছে।

বৃহস্পতিবার মোখা দখলের ঘটনায় সৌদি আরব-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল-ইরান সংঘাত শুরুর পর মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্যে এটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন।

সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়তে পারে সৌদি আরব। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতির কারণে সৌদি তেল রপ্তানির বিকল্প পথ হিসেবে লোহিত সাগরকে বেশি গুরুত্ব দিতে হচ্ছে। বাব আল-মান্দেবও যদি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে, তাহলে দেশটির তেল রপ্তানিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।

ইয়েমেনে আবার কেন তীব্র লড়াই

ইয়েমেনে যুদ্ধের শুরু ২০১৪ সালে। ওই বছর হুতিরা রাজধানী সানা দখলের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী হোদেইদাহর নিয়ন্ত্রণ নেয়। এর ফলে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকার বড় ধরনের সংকটে পড়ে।

ইরানের সমর্থনপুষ্ট হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরব ও তার মিত্ররা ২০১৫ সালে সরাসরি সামরিক অভিযান শুরু করে। তাদের লক্ষ্য ছিল ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে পুনরায় ক্ষমতায় আনা এবং ইরানের প্রভাব ঠেকানো।

২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি হলে বড় ধরনের সংঘর্ষ কমে আসে। তবে বিচ্ছিন্ন লড়াই চলতে থাকে। সাম্প্রতিক সময়ে আবারও তীব্র সংঘর্ষ শুরু হয়েছে। সরকারি বাহিনী প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করলেও দ্রুত অগ্রসর হয়েছে হুতিরা।

বাব আল-মান্দেব এত গুরুত্বপূর্ণ কেন

বাব আল-মান্দেব লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রণালি। এর মাধ্যমে জাহাজগুলো সুয়েজ খাল হয়ে ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে চলাচল করে।

ফলে এই সমুদ্রপথে অস্থিতিশীলতা তৈরি হলে শুধু ইয়েমেন বা সৌদি আরব নয়, বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ায় বাব আল-মান্দেবের গুরুত্বও বেড়েছে। একটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ বন্ধ বা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়লে জাহাজগুলোকে দীর্ঘ বিকল্প পথে যেতে হয়। এতে পরিবহন ব্যয়, বিমা ব্যয় এবং পণ্যের দাম বেড়ে যেতে পারে।

সৌদি আরবের জন্য বড় ঝুঁকি

হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতার কারণে সৌদি আরব তেল রপ্তানির বিকল্প পথ হিসেবে তার পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইনের ওপর আরও বেশি নির্ভর করছে। পাইপলাইনটি দেশের পূর্বাঞ্চলের তেলক্ষেত্র থেকে পশ্চিমাঞ্চলের ইয়ানবু বন্দরে তেল সরবরাহ করে। সেখান থেকে লোহিত সাগর হয়ে তেল রপ্তানি করা সম্ভব।

১৯৮০-এর দশক থেকেই চালু থাকা এই পাইপলাইন মূলত হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমানোর জন্য তৈরি করা হয়েছিল। সাম্প্রতিক সময়ে এর সক্ষমতাও বাড়ানো হয়েছে।

তবে বাব আল-মান্দেবও যদি হুতিদের হামলার ঝুঁকিতে পড়ে, তাহলে সৌদির বিকল্প রপ্তানি পথও অনিশ্চিত হয়ে উঠতে পারে। এরই মধ্যে সৌদি তেলবাহী জাহাজ ও জ্বালানি অবকাঠামোতে হুতিদের হামলার নজির রয়েছে।

শুক্রবার পাওয়া কিছু ছবিতে পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইনের কাছাকাছি ধোঁয়া দেখা গেলেও সেখানে হামলা হয়েছে কি না, সৌদি কর্তৃপক্ষ তা নিশ্চিত করেনি।

ইরানের জন্য কী লাভ

হুতিদের অগ্রযাত্রা ইরানের জন্যও কৌশলগত সুবিধা তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক আলম সালেহের মতে, হরমুজ প্রণালির পাশাপাশি বাব আল-মান্দেবেও ইরানের মিত্রদের প্রভাব তৈরি হওয়া তেহরানের কৌশলগত অবস্থান শক্তিশালী করছে।

এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ওপরও চাপ বাড়তে পারে। কারণ একই সময়ে হরমুজ ও বাব আল-মান্দেবের মতো গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে অস্থিরতা তৈরি হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহের ঝুঁকি বাড়বে।

বিশ্লেষকদের মতে, হুতিদের সাফল্য মধ্যপ্রাচ্যে শক্তির ভারসাম্যকে ইরান ও তার মিত্রদের দিকে আরও কিছুটা ঠেলে দিতে পারে।

কেন দ্রুত এগোতে পারছে হুতিরা

হুতিদের অগ্রযাত্রার পেছনে শুধু তাদের সামরিক সক্ষমতা নয়, ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর দুর্বলতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

সরকারি বাহিনীর মধ্যে বিভাজন, বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি এবং সৌদি-সমর্থিত পক্ষগুলোর অভ্যন্তরীণ বিরোধ তাদের প্রতিরোধ দুর্বল করেছে।

অন্যদিকে দীর্ঘদিনের যুদ্ধের ফলে হুতিরা যুদ্ধ পরিচালনা ও দ্রুত কৌশল পরিবর্তনে অভিজ্ঞ হয়ে উঠেছে। ইরানের কাছ থেকে পাওয়া ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও অন্যান্য সামরিক প্রযুক্তিও তাদের সক্ষমতা বাড়িয়েছে বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।

তবে সামরিক সাফল্য ধরে রেখে দীর্ঘমেয়াদে বড় এলাকা শাসন করা হুতিদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে।

পুরো লোহিত সাগর কি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে হুতিরা

হুতিদের পুরো বাব আল-মান্দেব বা লোহিত সাগরের প্রতিটি অংশ সরাসরি নিয়ন্ত্রণে রাখা প্রয়োজন নাও হতে পারে। বরং সমুদ্রপথটিকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারলেই তারা বড় ধরনের কৌশলগত প্রভাব ফেলতে পারবে।

কারণ কোনো পথে হামলার আশঙ্কা তৈরি হলেই জাহাজ কোম্পানি ও বিমা প্রতিষ্ঠানগুলো সেই পথ এড়িয়ে চলতে পারে। এতে জাহাজ চলাচল কমে গিয়ে তেল ও অন্যান্য পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হতে পারে।

ফলে হুতিদের সামরিক নিয়ন্ত্রণের চেয়েও বড় বিষয় হয়ে উঠতে পারে তাদের তৈরি করা নিরাপত্তাঝুঁকি।

সৌদি আরব কি হুতিদের থামাতে পারবে

হুতিদের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে সৌদি আরব পাল্টা সামরিক অভিযান চালাচ্ছে। মোখাসহ হুতিদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলার খবরও পাওয়া গেছে। তবে এসব হামলা এখন পর্যন্ত তাদের অগ্রযাত্রা পুরোপুরি থামাতে পারেনি।

সৌদি আরবের শক্তিশালী বিমানবাহিনী থাকলেও শুধু বিমান হামলার মাধ্যমে হুতিদের দীর্ঘমেয়াদে নিয়ন্ত্রণে আনা কতটা সম্ভব, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

এদিকে সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকেও সামরিক সহায়তা চেয়েছে বলে মার্কিন সংবাদমাধ্যমে খবর এসেছে। তবে সরাসরি মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপ হলে চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ফলে সৌদি আরবকে এখন সামরিক প্রতিরোধের পাশাপাশি কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক কৌশলও কাজে লাগাতে হতে পারে।

সব মিলিয়ে, ইয়েমেনে হুতিদের সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রা শুধু দেশটির অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াই নয়। বাব আল-মান্দেবকে ঘিরে পরিস্থিতি আরও জটিল হলে এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়তে পারে বৈশ্বিক বাণিজ্য, জ্বালানি সরবরাহ ও মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ভারসাম্যে।

হরমুজ প্রণালির পর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ ঝুঁকিতে পড়লে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ ও দামের ওপর নতুন চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্য আরও এক ধাপ ইরান ও তার মিত্রদের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে।

Leave A Reply


Math Captcha
− 1 = 2