Friday, November 6

১৯ বছর বয়সে গ্রেপ্তার দুই বোনের বিরুদ্ধে নির্যাতন করে স্বীকারোক্তি নেওয়ার অভিযোগ পরিবারের

ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার অভিযোগে গ্রেপ্তার দুই যমজ বোনের একজনকে মৃত্যুদণ্ড এবং অন্যজনকে ২৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত তারানেহ রহিমি এবং তার যমজ বোন রোমিনা রহিমি গত জানুয়ারিতে ইসফাহানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

বিক্ষোভের সময় দুই বোনের বয়স ছিল ১৯ বছর এবং তারা উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। পরিবারের দাবি, বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার প্রায় এক মাস পর গভীর রাতে মুখোশ পরা কয়েকজন ব্যক্তি তাদের বাড়িতে ঢুকে দুজনকে ঘুম থেকে তুলে নিয়ে যান। পরে পরিবার জানতে পারে, ওই ব্যক্তিরা ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) সদস্য ছিলেন।

চার মাস পর কারাগারে থাকার খবর

পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, দুই মেয়েকে খুঁজে পেতে তাদের মা মারজিয়ে নুরমোহাম্মাদি বিভিন্ন হাসপাতাল, আদালত ও সরকারি প্রতিষ্ঠানে যোগাযোগ করেন। প্রায় চার মাস পর তিনি জানতে পারেন, তার দুই মেয়ে কারাগারে রয়েছেন।

গত মে মাসে ইসফাহানের দৌলতাবাদ কারাগারে গিয়ে মেয়েদের দেখতে পান তিনি। পরিবারের দাবি, তখন দুই বোনের শরীরে গুরুতর আঘাতের চিহ্ন ছিল।

যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী তাদের চাচাতো ভাই মাসুদ নুরমোহাম্মাদি অভিযোগ করেন, দুই বোনের চুল টেনে তাদের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নেওয়া হয়েছিল। এতে মাথার বিভিন্ন অংশের চুল উঠে যায় এবং মুখ ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন দেখা যায় বলে তিনি দাবি করেন।

তার অভিযোগ, কারাগারে তারানেহকে বলা হয়েছিল—স্বীকারোক্তিতে স্বাক্ষর না করলে তার বোন রোমিনাকে তার সামনেই ধর্ষণ করা হবে।

স্বীকারোক্তি নির্যাতনের মাধ্যমে নেওয়ার অভিযোগ

আদালতে তারানেহ দাবি করেছেন, তার কাছ থেকে নেওয়া স্বীকারোক্তি নির্যাতনের মাধ্যমে আদায় করা হয়েছিল বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

তবে দুই বোন বিক্ষোভের সময় কোনো সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন কি না এবং তাদের বিরুদ্ধে এ ধরনের কোনো প্রমাণ আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছিল কি না, তা স্পষ্ট নয়।

পরিবারের দাবি, জানুয়ারির বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার আগে দুই বোন কোনো প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নেননি।

কেন দুই বোনের সাজায় এত পার্থক্য?

ইরানের আদালতের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, তারানেহকে মৃত্যুদণ্ড এবং রোমিনাকে ২৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তবে দুই বোনের সাজায় এত বড় পার্থক্যের কারণ এখনো স্পষ্ট নয়।

সাজা ঘোষণার পর থেকে পরিবারের সদস্যরা তাদের সঙ্গে আর দেখা করতে পারেননি বলে জানিয়েছেন নুরমোহাম্মাদি।

তার দাবি, তারানেহকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয় তৈরি এবং ভবিষ্যতে অন্যদের বিক্ষোভে অংশ নেওয়া থেকে বিরত রাখতেই তারানেহকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

ইরানে বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুদণ্ডের অভিযোগ

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছর ইরানে এখন পর্যন্ত ৫০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। এর মধ্যে জানুয়ারির সরকারবিরোধী বিক্ষোভের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে অন্তত ২৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে অন্তত ১৬ জন নারী।

এ ছাড়া শত শত বিক্ষোভকারীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে অথবা এমন অভিযোগে বিচার করা হচ্ছে, যার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হতে পারে। ইসফাহানেই এ ধরনের অভিযোগে ৭০ জনের বেশি মানুষ রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

গত মাসে যুক্তরাজ্যসহ ৩০টি দেশ জানুয়ারির বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের মৃত্যুদণ্ডের নিন্দা জানিয়ে যৌথ বিবৃতি দেয়। বিবৃতিতে এসব মৃত্যুদণ্ডকে ভিন্নমত দমনের প্রচেষ্টা হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

পরিবারের ওপরও হুমকির অভিযোগ

পরিবারের দাবি, তারানেহ ও রোমিনা ৮ ও ৯ জানুয়ারি ইসফাহানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে অংশ নেন। এর প্রায় এক মাস পর তাদের বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হলেও দীর্ঘ সময় পরিবারকে তাদের অবস্থান সম্পর্কে কোনো তথ্য জানানো হয়নি।

দুই মেয়েকে কারাগারে দেখার পর তাদের মা প্রথমে চিনতেই পারেননি বলে জানিয়েছেন নুরমোহাম্মাদি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, দুই বোনের মুখ ফুলে ছিল, শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন ছিল এবং কনুই, আঙুল ও পায়ে গুরুতর আঘাত দেখা যায়। তাদের চুলও টেনে ছিঁড়ে ফেলা হয়েছিল বলে অভিযোগ করা হয়েছে। একপর্যায়ে তাদের একাকী কারাবাসেও রাখা হয়েছিল বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

দুই মেয়েকে একাই বড় করেছেন তাদের মা মারজিয়ে নুরমোহাম্মাদি। পরিবারের দাবি, তিনি মেয়েদের বিচার কার্যক্রমেও উপস্থিত থাকতে পারেননি।

নুরমোহাম্মাদি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন। তিনি জানান, পরিবারের সদস্যরা মামলাটি নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলার কারণে মুঠোফোনের বার্তা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের মৃত্যুর হুমকিও দেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও জানান, তার মা বর্তমানে তার সঙ্গে রয়েছেন। মেয়েদের কথা মনে পড়লেই তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন।

Leave A Reply


Math Captcha
+ 56 = 64