সাইকোঅ্যাকটিভ মাদক পরীক্ষায় পজিটিভ হওয়ায় দিল্লি-ফুকেট রুটে চলাচলকারী একটি ফ্লাইটের প্রধান পাইলটকে বরখাস্ত করেছে এয়ার ইন্ডিয়া। শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) পাইলটকে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত জানায় বিমান সংস্থাটি।
এর আগে এয়ারক্রাফট অ্যাক্সিডেন্ট ইনভেস্টিগেশন ব্যুরোর (এএআইবি) প্রাথমিক প্রতিবেদনে ওই পাইলটের বিরুদ্ধে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিতে ভারতের ডিরেক্টরেট জেনারেল অব সিভিল এভিয়েশনকে (ডিজিসিএ) সুপারিশ করা হয়।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, চূড়ান্ত নিশ্চিতকরণ পরীক্ষায় ওই প্রধান পাইলটের শরীরে গাঁজার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এএআইবির প্রতিবেদনে বিষয়টিকে গুরুতর উল্লেখ করে পাইলটের বিরুদ্ধে দ্রুত যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ডিজিসিএকে সুপারিশ করা হয়েছে।
এএআইবির পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শেষ হতে এক বছর বা তারও বেশি সময় লাগতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, ফ্লাইটটি অল্প সময়ের জন্য উচ্চতা হারানোর সময় বিমানের তিনটি হাইড্রলিক ব্যবস্থাই বিকল হয়ে যায়। একই সময়ে অটোপাইলট বন্ধ হয়ে যায় এবং প্রায় দুই সেকেন্ডের জন্য স্টল সতর্কবার্তা সক্রিয় হয়। পর্যাপ্ত লিফট তৈরি না হলে বিমান নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নিচে নেমে যাওয়ার আশঙ্কায় এ ধরনের সতর্কবার্তা দেওয়া হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঘটনার সময় বিমানটি নির্ধারিত ৩৬ হাজার ফুট উচ্চতা থেকে প্রথমে আরও ৩৭২ ফুট ওপরে ওঠে এবং পরে ২৯২ ফুট নিচে নেমে যায়। এ সময় বিমানের নিয়ন্ত্রণে থাকা কো-পাইলট দ্রুত পরিস্থিতি সামাল দেন। পরবর্তী সময়ে হাইড্রলিক ব্যবস্থাগুলো স্বাভাবিক হলে ফ্লাইট পরিচালনাও স্বাভাবিক হয়ে আসে।
বিমানটি তখন ক্রুজিং উচ্চতায় থাকায় সিটবেল্টের সংকেত বন্ধ ছিল। ফলে আকস্মিক উচ্চতা পরিবর্তনের সময় বেশ কয়েকজন যাত্রী ও ক্রু সদস্য আহত হন। ঝাঁকুনির ঘটনায় বিমানের কেবিনের বিভিন্ন অংশও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ছাদের প্যানেলে ফাটল ও খুলে যাওয়া, হাতল বাঁকা বা ভেঙে যাওয়া, জরুরি বহির্গমন পথ ও ওপরের লাগেজ রাখার বক্সের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া একটি টয়লেটের কমোড খুলে যাওয়ার পাশাপাশি পেছনের দরজার কাছে থাকা একটি ক্রু সিটসহ আরও কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এয়ার ইন্ডিয়ার এআই-২৩৭৯ ফ্লাইটটি ১৩৭ জন যাত্রী ও আটজন ক্রু সদস্য নিয়ে ফুকেট থেকে দিল্লি যাচ্ছিল। ভারতের ওড়িশা উপকূলের কাছাকাছি মাঝআকাশে বিমানটি হঠাৎ ক্লিয়ার এয়ার টার্বুলেন্সের মুখে পড়ে এবং আনুমানিক ৩০০ ফুট উচ্চতা হারায়।
ভারতের বেসামরিক বিমান চলাচলমন্ত্রী কে রামমোহন নাইডু জানিয়েছিলেন, প্রায় চার থেকে পাঁচ মিনিট স্থায়ী ওই ঝাঁকুনিতে বেশ কয়েকজন যাত্রী ও ক্রু সদস্য আহত হন। কয়েকজন কেবিন ক্রু সদস্য ঘাড় ও মেরুদণ্ডে গুরুতর আঘাত পান বলেও তিনি জানান। আহত অবস্থাতেও পরবর্তী প্রায় এক ঘণ্টা তারা যাত্রীদের সেবা দিয়ে গেছেন বলে জানান মন্ত্রী।
দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের পর আহতদের হাসপাতালে নেওয়া হয়। মোট ১৭ জন—১৩ জন যাত্রী ও চারজন কেবিন ক্রু—হাসপাতালে ভর্তি হন। এয়ার ইন্ডিয়ার পক্ষ থেকে জানানো হয়, প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে পরদিনই সব যাত্রীকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
এ ঘটনায় ফ্লাইটে থাকা এক যাত্রী ডিজিসিএর ‘এয়ারসেবা’ পোর্টালে লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগে তিনি জানান, তীব্র ঝাঁকুনির সময় কয়েকজন যাত্রী আসন থেকে ছিটকে বিমানের ছাদে আঘাত পান। এতে তার ৬২ বছর বয়সী শাশুড়ির পাঁজর ও মেরুদণ্ডে এবং ৬৪ বছর বয়সী শ্বশুরের শরীরে আঘাত লাগে।
ওই যাত্রী প্রশ্ন তোলেন, এত বড় ঝাঁকুনির ঘটনায় বয়স্ক যাত্রীরা গুরুতর আহত হওয়ার পরও কেন বিমানটি দিল্লির পরিবর্তে কাছাকাছি অন্য কোনো বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করানো হয়নি। দিল্লিতে অবতরণের পর পর্যাপ্ত হুইলচেয়ার, অ্যাম্বুলেন্স ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সহায়তা না পাওয়ার অভিযোগও করেন তিনি। এমনকি বিমানের ভেতরে ভিডিও বা ছবি ধারণ না করার জন্য ক্যাপ্টেন যাত্রীদের সতর্ক করেছিলেন বলেও অভিযোগ করেন ওই যাত্রী।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে এয়ার ইন্ডিয়া জানিয়েছে, বিষয়টি তারা অভ্যন্তরীণভাবে খতিয়ে দেখছে। যাত্রীদের নিরাপত্তা ও সুবিধাকে তারা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে থাকে বলেও জানিয়েছে বিমান সংস্থাটি।

