Friday, November 6

নেপালের পাহাড়ি অঞ্চলে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার পাঁচ দিন পেরিয়ে গেলেও স্বজনদের অপেক্ষার শেষ হয়নি। উদ্ধার হওয়া শত শত মরদেহের ভিড়ে প্রিয়জনকে শনাক্ত করার আশায় দূরদূরান্ত থেকে ছুটে আসছেন তারা। কেউ খুঁজছেন মুখের পরিচিত কোনো রেখা, কেউ পোশাকের টুকরো কিংবা শরীরের কোনো বিশেষ চিহ্ন—যেকোনো কিছু, যা প্রিয়জনের শেষ পরিচয় হয়ে উঠতে পারে।

নদীর স্রোতের নিম্নাঞ্চলে অবস্থিত নেপালের ভারতপুর শহরের একটি সরকারি ভবনকে অস্থায়ী মরদেহ শনাক্তকরণ কেন্দ্রে পরিণত করা হয়েছে। সেখানে ছোট একটি টেলিভিশন পর্দায় উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলোর ছবি একের পর এক দেখানো হচ্ছে। নীরবে সেই পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকছেন স্বজনেরা।

পাশের আরেকটি সরকারি ভবন অস্থায়ী মর্গ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। সেখানে প্রায় ২৭০টি মরদেহ রাখা হয়েছিল। এর মধ্যে অধিকাংশের পরিচয় তখনও শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।

নেপালের ভয়াবহ এই দুর্যোগে স্থানীয় সময় রোববার রাত পর্যন্ত প্রায় ৮০০টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন আড়াই হাজারের বেশি মানুষ। ফলে উদ্ধারকাজ যত এগোচ্ছে, মৃতের সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কাও তত স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

দুর্গম এলাকায় উদ্ধার অভিযান

গত বুধবার নেপালের উত্তরাঞ্চল ও তিব্বতের ওপর দিয়ে ভয়াবহ বন্যার স্রোত নেমে আসে। একটি হিমবাহ পাহাড়ের ঢাল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিচে পড়ে যাওয়ার পর আকস্মিক এই বন্যার সৃষ্টি হয়। সৃষ্ট কম্পন এতটাই তীব্র ছিল যে, স্থানীয় কর্মকর্তারা প্রথমে সেটিকে ভূমিকম্প বলে ধারণা করেছিলেন।

হিমবাহের পতনে সৃষ্টি হওয়া বিশাল জল ও কাদার স্রোত গ্রামবাসী, জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কর্মী এবং বিভিন্ন দেশের পর্যটক ও ভ্রমণকারীদের ভাসিয়ে নিয়ে যায়। অনেকেই ওই এলাকায় ধর্মীয় তীর্থযাত্রা কিংবা ভ্রমণে গিয়েছিলেন।

বন্যায় বহু স্থাপনা ও যোগাযোগব্যবস্থা ধ্বংস হয়েছে। সড়ক ও সেতু ভেঙে যাওয়ায় দুর্গম এলাকাগুলোতে উদ্ধারকারী দল পৌঁছাতেও বড় ধরনের সমস্যার মুখে পড়ছে।

উদ্ধার অভিযানের বড় অংশ কেন্দ্রীভূত হয়েছে রসুয়া জেলার কয়েকটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে। বন্যার সবচেয়ে ভয়াবহ আঘাতগুলোর কয়েকটি এই এলাকাতেই আঘাত হানে। পাশের নুওয়াকোট জেলাতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

নেপাল সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রাজা রাম বাসনেত জানান, ভারতীয় উদ্ধারকারী দলের সহায়তায় একটি সুড়ঙ্গের প্রবেশমুখ শনাক্ত করা গেলেও সেটি পানিতে পুরোপুরি ডুবে রয়েছে। দ্বিতীয় একটি সুড়ঙ্গের প্রবেশমুখ খুঁজে পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে।

জীবিতদের সন্ধানে তাপ শনাক্ত করতে সক্ষম ড্রোন ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত ওই এলাকায় জীবিত মানুষের উপস্থিতির কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি।

পরিচয়হীন মরদেহের দীর্ঘ সারি

বন্যার স্রোত এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, কিছু মরদেহ শত শত মাইল দূরে ভেসে গিয়ে প্রতিবেশী ভারতেও পাওয়া গেছে।

বন্যার নিম্নাঞ্চলে অবস্থিত চিতওয়ান জেলার কর্মকর্তারা একপর্যায়ে মরদেহ সংরক্ষণ করতে গিয়ে বিপাকে পড়েন। জেলার মর্গগুলোতে একসঙ্গে মাত্র ৩৬টির কিছু বেশি মরদেহ রাখার সক্ষমতা রয়েছে।

ফলে ভারতপুরের একটি সরকারি ভবনকে অস্থায়ী মর্গ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। সেখানে মাত্র একটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রণযন্ত্র থাকায় মরদেহ সংরক্ষণের জন্য শুষ্ক বরফ সংগ্রহেরও চেষ্টা করা হয়।

কর্তৃপক্ষ একই সঙ্গে একটি সহায়তা ডেস্ক ও দর্শনার্থী কক্ষ তৈরি করে। উদ্ধার হওয়া প্রতিটি মরদেহের ছবি তোলা হয়, যাতে নিখোঁজ স্বজনেরা এসে সেগুলো দেখে পরিচয় শনাক্ত করতে পারেন।

কিন্তু দীর্ঘ সময় পানিতে থাকার কারণে মরদেহগুলো দ্রুত বিকৃত হয়ে যাচ্ছিল। বর্ষার উষ্ণ আবহাওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে।

এদিকে আন্তর্জাতিক সহায়তার মাধ্যমে চাওয়া হিমায়িত সংরক্ষণযন্ত্রও দ্রুত পৌঁছায়নি। ফলে মাত্র প্রায় এক ডজন মরদেহ শনাক্ত করে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা সম্ভব হয়েছিল। এর মধ্যেই নতুন করে আরও মরদেহ ভেসে আসতে থাকে।

অস্থায়ী মর্গে দায়িত্ব পালনকারী জ্যেষ্ঠ ট্রাফিক পুলিশ কর্মকর্তা অনিল থাপা বলেন, প্রতিদিনই ১৫ থেকে ২০টি নতুন মরদেহ উদ্ধার হচ্ছে। তার আশঙ্কা, এই উদ্ধারকাজ আরও কয়েক মাস ধরে চলতে পারে।

শুরু হয়েছে গণদাফন

মরদেহ সংরক্ষণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় কর্তৃপক্ষ গণদাফনের সিদ্ধান্ত নেয়। তবে পরিচয় শনাক্তের সম্ভাবনা যেন নষ্ট না হয়, সে জন্য প্রতিটি মরদেহের ছবি তোলা, শরীরের বিশেষ চিহ্ন ও সঙ্গে পাওয়া পোশাকের বিবরণ সংরক্ষণ এবং ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে।

এরপর মরদেহগুলোকে পৃথক নম্বর দিয়ে চিহ্নিত করা হচ্ছে।

শনিবার গভীর রাতে ভারতপুর শহর থেকে প্রায় ১০ মিনিট দূরের সবুজে ঘেরা একটি বনাঞ্চলে ৯৩টি মরদেহ দাফন করা হয়। পরদিন আরও প্রায় ১০০টি মরদেহ দাফন করা হয়।

দাফনের আগে প্রতিটি মরদেহ স্ট্রেচারে করে নির্ধারিত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রতিটি কবরের পরিচয় সংরক্ষণের জন্য ধাতব নম্বরযুক্ত চিহ্নও রাখা হয়েছে।

‘আমি জানি তারা আর নেই, তবু আশা ছাড়িনি’

রোববার সন্ধ্যায় গণদাফনের শেষ পর্যায়ের কাজ চলার সময় ১৭ বছর বয়সী বীরেশ কুমার সাহ আট ঘণ্টার বাসযাত্রা শেষে ভারতপুরের অস্থায়ী মর্গে পৌঁছান।

তার বাবা একজন গণিতের শিক্ষক। ছোট ভাইও একই স্কুলে পড়ত। বন্যার সময় দুজনই নিখোঁজ হন।

প্রথম দিকে বিষয়টি মেনে নিতে পারেননি বীরেশ। তিনি বলেন, প্রথম দিন সবার কাছ থেকে খবরটি গোপন রাখার চেষ্টা করেছিলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাবার নিখোঁজ হওয়ার খবর দেওয়ার পর তার বাবার এক সহকর্মী যোগাযোগ করেন। তিনি জানান, বীরেশের বাবা ও ভাইকে বন্যার স্রোতে ভেসে যেতে দেখেছেন।

তবু আশা ছাড়েননি তিনি।

বীরেশ বলেন, ‘আমি জানি তারা আর নেই। কিন্তু তারপরও আমি আশা ছাড়িনি।’

তার এক চাচি যখন পরিবারের সদস্যদের বাস্তবতা মেনে নিয়ে শেষকৃত্যের প্রস্তুতি নেওয়ার কথা বলেন, তখন বীরেশ তাকে থামিয়ে দেন। চোখ সরিয়ে নিয়ে তিনি জানান, এসব শেষকৃত্যের রীতি সম্পর্কে তিনি কিছুই জানেন না। নিজেকে অসহায় লাগছে তার।

শেষ আশাটুকুও ফিকে হয়ে আসছে

৩১ বছর বয়সী রমেশ দাহালও একই টেলিভিশন পর্দায় মরদেহের ছবি দেখছিলেন। তার ২১ বছর বয়সী ভাতিজা সুমান দাহাল ছিলেন একজন গাইড। বন্যার সময় তিনি রসুয়ায় একদল পর্বতারোহী ও পর্যটককে নিয়ে ছিলেন।

প্রথম দিকে রমেশের বিশ্বাস ছিল, হয়তো সুমান ও তার দলের অন্যরা বন্যার আগেই নিরাপদ কোনো উঁচু এলাকায় আশ্রয় নিয়েছেন। কিন্তু দিন যত যাচ্ছে, সেই আশাও ক্ষীণ হয়ে আসছে।

তিনি বলেন, এখন মনে হচ্ছে তার ভাতিজার মরদেহ খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা হয়তো মাত্র শূন্য দশমিক এক শতাংশ।

নেপালের এই ভয়াবহ দুর্যোগে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকলেও সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। একদিকে নিখোঁজ স্বজনদের ফিরে পাওয়ার আশায় অপেক্ষা করছেন পরিবারগুলো, অন্যদিকে উদ্ধার হওয়া পরিচয়হীন মরদেহের সংখ্যা বাড়ছে প্রতিদিন।

প্রতিটি মরদেহ এখন শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়—কোনো না কোনো পরিবারের কাছে সেটিই হয়তো দীর্ঘ অপেক্ষার শেষ উত্তর।

Leave A Reply


Math Captcha
+ 82 = 86