ইরানের সঙ্গে ‘ভালো’ ও ‘গভীর’ আলোচনা চলছে বলে দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে চলমান আলোচনা ব্যর্থ হলে আবারও ‘খুব কঠোর সামরিক পদক্ষেপ’ নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তিনি। যদিও ইরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে বার্তা আদান-প্রদান চললেও বর্তমানে সরাসরি কোনো আলোচনা হচ্ছে না।
এদিকে টানা চার দিনের মতো সোমবারও ইরানে মার্কিন সামরিক হামলা স্থগিত ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জামের ঘাটতির কারণে হামলা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে ট্রাম্প এ দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর অনুরোধেই হামলা স্থগিত করা হয়েছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত শুক্রবার হোয়াইট হাউসে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন সামরিক গোলাবারুদের মজুত এবং সম্ভাব্য নেতিবাচক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। বৈঠকে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও উপস্থিত ছিলেন।
মার্কিন হামলা বন্ধ থাকায় ইরানও পাল্টা হামলা স্থগিত রেখেছে। তেহরান দাবি করেছে, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এখনো তাদের হাতেই রয়েছে। ওমানের সঙ্গে যৌথভাবে নৌযান চলাচলের নতুন ব্যবস্থাপনা তৈরির কাজ চলছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ভূমিকা নেই।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসন শুরুর পর বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালিতে কার্যত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে ইরান। পরে গত ১৭ জুন ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একটি প্রাথমিক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়। এরপর সীমিত পরিসরে কিছু তেলের ট্যাংকার চলাচল শুরু হলেও নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ায় পরিস্থিতি আবারও জটিল হয়ে ওঠে। টানা ১৩ রাত সামরিক অভিযানের পর গত শুক্রবার থেকে যুক্তরাষ্ট্র হামলা স্থগিত রেখেছে।
আজ ২৮ জুলাই এই যুদ্ধের পাঁচ মাস পূর্ণ হলেও সংকটের স্থায়ী সমাধানের কোনো সুস্পষ্ট লক্ষণ এখনো দেখা যায়নি।
‘ভালো আলোচনা’ চলছে: ট্রাম্প
মিশিগানে যাওয়ার পথে প্রেসিডেন্টের উড়োজাহাজ এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, “ইরানের সঙ্গে আমাদের ভালো আলোচনা চলছে। ভালো কিছু ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে।”
তিনি আরও জানান, ইরানকে স্যাটেলাইট চিত্র সরবরাহের বিষয়টি নিয়ে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে আলোচনা করবেন।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, “ইরানের সঙ্গে অত্যন্ত গভীর আলোচনা চলছে। তবে আলোচনা ব্যর্থ হলে যুক্তরাষ্ট্র আবারও খুব কঠোর সামরিক পদক্ষেপে ফিরে যাবে।”
ইরানকে কত সময় দেওয়া হবে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “বেশি সময় নয়। হয় দ্রুত অগ্রগতি হবে, নয়তো হবে না।”
কেন থেমেছে মার্কিন হামলা?
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টানা ১৩ দিনের সামরিক অভিযানের পর মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা ট্রাম্পকে জানিয়েছেন, অভিযানের কার্যকারিতা প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার গোলাবারুদের মজুত নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
তবে গোলাবারুদের ঘাটতির খবর নাকচ করে দিয়েছেন ট্রাম্প। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে তিনি বলেন, “বিশ্বের যেকোনো দেশের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বেশি গোলাবারুদ রয়েছে, এমনকি প্রয়োজনের চেয়েও বেশি।”
হরমুজ প্রণালি নিয়ে অনড় তেহরান
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে আলোচনার জন্য ইরান কোনো অনুরোধ জানায়নি। ওয়াশিংটনের এ ধরনের দাবি ‘মনগড়া’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালি নিয়ে ওমানের সঙ্গে ইরানের আলোচনা পুরোপুরি দ্বিপক্ষীয়। গত শুক্রবার ও শনিবার দুই দেশের কর্মকর্তারা নিরাপদ নৌ চলাচল নিশ্চিত করার নীতিগত ও কারিগরি বিষয় নিয়ে বৈঠক করেছেন।
ইরানের দাবি, হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনা, নৌযান চলাচলের তদারকি এবং সেবা ফি আদায়ের অধিকার তারা কোনোভাবেই ছাড়বে না। দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, অনুমতি ছাড়া নির্ধারিত পথের বাইরে চলাচলের চেষ্টা করায় সোমবার ছয়টি জাহাজকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
যুদ্ধ থামলেও উত্তেজনা বহাল
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি সামরিক হামলা বন্ধ থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে।
সৌদি আরব জানিয়েছে, তারা ইরাক থেকে উৎক্ষেপণ করা কয়েকটি ড্রোন ভূপাতিত করেছে। দেশটির দাবি, ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলো তেল স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে এসব হামলার চেষ্টা চালিয়েছে।
অন্যদিকে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা সৌদির তেল পরিবহন-সম্পর্কিত স্থাপনায় ড্রোন হামলার দায় স্বীকার করেছে। একই সময়ে জর্ডান ও ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলেও ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে। তবে এসব ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে হতাহতের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
আলোচনার পথ এখনো অনিশ্চিত
ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকে ৬০ দিনের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনার মাধ্যমে একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে পৌঁছানোর পরিকল্পনা ছিল। এ আলোচনায় ইরানের পরমাণু কর্মসূচিসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই পক্ষের মতবিরোধের জেরে নতুন করে সংঘাত শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের স্বার্থে প্রণালিতে অবাধ চলাচল নিশ্চিত করতে হবে। বিপরীতে ইরান বলছে, সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী প্রণালির নৌ চলাচল তদারকির অধিকার তাদেরই রয়েছে।
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ১৮ জন সেনা নিহত এবং ৬২৪ জন আহত হয়েছেন। অন্যদিকে সিবিএস নিউজ ও ইউগভের যৌথ জরিপে দেখা গেছে, ৭৬ শতাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন, ইরান যুদ্ধ ট্রাম্প প্রশাসনের প্রত্যাশার তুলনায় অনেক বেশি জটিল হয়ে উঠেছে।
তেহরানের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশও তাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত সামরিক অভিযানে অংশ নিয়েছে।

