Thursday, October 15

চাকরির প্রলোভনে ওয়ার্ক পারমিট ভিসায় রাশিয়ায় নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো ৩০ বাংলাদেশির মধ্যে ২০ জনের মৃত্যুর প্রাথমিক তথ্য পেয়েছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)। সংস্থাটির দাবি, তাঁদের মধ্যে প্রথম দিনেই ১৭ জনের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় মানবপাচার চক্রের দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

বুধবার (১৪ অক্টোবর) রাজধানীর কারওয়ান বাজারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান এসআরবি-১০ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোহা. আসাদুজ্জামান।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন জাবালে নূর ইন্টারন্যাশনালের প্রতিষ্ঠাতা মিজানুর রহমান (৫৫) এবং আবু তাহের ওরফে লেন্টু। এসআরবির দাবি, বাংলাদেশিদের রাশিয়ায় পাঠানোর ঘটনায় জাবালে নূর ইন্টারন্যাশনাল, আরএস ইন্টারন্যাশনাল ও টিএস গ্রুপ নামের তিনটি প্রতিষ্ঠান জড়িত ছিল।

চাকরির কথা বলে নিয়ে যাওয়া হয় রাশিয়ায়

এসআরবির প্রাথমিক অনুসন্ধান অনুযায়ী, চলতি বছরের ৭ মে ওই তিন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ৩০ বাংলাদেশিকে ওয়ার্ক পারমিট ভিসায় রাশিয়ায় পাঠানো হয়। তাঁদের মধ্যে ২১ জনকে জাবালে নূর ইন্টারন্যাশনালের প্রতিষ্ঠাতা মিজানুর রহমানের মাধ্যমে পাঠানোর প্রক্রিয়া করা হয়েছিল বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

এসআরবির কর্মকর্তা মোহা. আসাদুজ্জামান বলেন, রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর বাংলাদেশিদের একটি স্থানীয় হোটেলে আটকে রাখা হয়। তাঁদের পাসপোর্ট, মোবাইল ফোন ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জব্দ করা হয়। পরে প্রতিশ্রুত চাকরিতে নিয়োগ না দিয়ে তাঁদের রাশিয়ার সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

তাঁদের ২১ দিনের যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়েছিল বলে জানায় এসআরবি।

প্রথম দিনেই ১৭ জনের মৃত্যুর তথ্য

এসআরবির ভাষ্য অনুযায়ী, যুদ্ধক্ষেত্রে বাংলাদেশিদের তিনটি দলে ভাগ করে মোতায়েন করা হয়েছিল। প্রথম দলে ফ্রন্টলাইনে ছিলেন ১৬ জন, মাঝের দলে ছয়জন এবং শেষের দলে ছিলেন আটজন।

সংস্থাটির দাবি, প্রথম দিন ফ্রন্টলাইনে থাকা ১৬ জনের মধ্যে ১২ জন, মাঝের দলে থাকা ছয়জনের মধ্যে চারজন এবং শেষের দলে থাকা আটজনের মধ্যে চারজন মারা যান। সব মিলিয়ে প্রথম দিনের যুদ্ধে ২০ জনের মধ্যে ১৭ জনের মৃত্যুর তথ্য পেয়েছে এসআরবি। তবে বাকি তিনজনের মৃত্যুর সময় ও পরিস্থিতি সম্পর্কে সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত জানানো হয়নি।

এসআরবির কর্মকর্তা বলেন, ভুক্তভোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ, তাঁদের পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য এবং বিভিন্ন সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে মৃত্যুর প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। তবে মৃত্যুর তথ্য ও পরিচয় চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত করতে আরও যাচাই প্রয়োজন হতে পারে।

আহত অবস্থায় দেশে ফিরেছেন দুজন

এসআরবি জানায়, ওই ৩০ বাংলাদেশির মধ্যে দুজন গুরুতর আহত অবস্থায় দেশে ফিরেছেন। বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে তাঁদের ফেরানো হয়। তাঁদের একজন রাজন, অন্যজন আদনান।

রাজনের বরাত দিয়ে এসআরবির কর্মকর্তা বলেন, যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁর পিঠের ওপর একটি ড্রোন পড়ে। এতে তাঁর কোমর ভেঙে যায় এবং শরীরের নিচের অংশ অবশ হয়ে আসতে থাকে। পরে ওয়াকিটকির মাধ্যমে একজন মিশরীয় অনুবাদকের সহায়তায় উদ্ধারের অনুরোধ জানান তিনি। কিন্তু তাঁকে উদ্ধারে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

এসআরবির ভাষ্য অনুযায়ী, গুরুতর আহত অবস্থায় রাজন শরীরের ওপরের অংশের ভর দিয়ে প্রায় চার কিলোমিটার পথ এগিয়ে ক্যাম্পের কাছাকাছি পৌঁছান। পরে চিকিৎসা পাওয়ার ক্ষেত্রেও তাঁকে নানা বাধার মুখে পড়তে হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।

প্রতিপক্ষের অবস্থান শনাক্তে ব্যবহারের অভিযোগ

এসআরবির প্রাথমিক ধারণা, যুদ্ধের অভিজ্ঞতা ও পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ না থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশিদের ফ্রন্টলাইনে পাঠানো হয়েছিল প্রতিপক্ষের অবস্থান শনাক্ত করার উদ্দেশ্যে। সংস্থাটির কর্মকর্তা দাবি করেন, প্রতিপক্ষের হামলার মাধ্যমে তাদের অবস্থান চিহ্নিত করার জন্য বাংলাদেশিদের ঝুঁকিপূর্ণভাবে সামনে পাঠানো হয়ে থাকতে পারে।

তবে এ বিষয়ে রাশিয়ার কর্তৃপক্ষের বক্তব্য বা স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো তথ্য সংবাদ সম্মেলনে উপস্থাপন করা হয়নি।

ঋণ করে বিদেশে গিয়েছিলেন অনেকে

এসআরবির কর্মকর্তা জানান, ভুক্তভোগীদের তালিকা ও মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করা হয়েছে এবং তাঁদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, নিহতদের অনেকেই দরিদ্র পরিবারের সন্তান। কেউ ঋণ নিয়ে, কেউ আবার অন্যের কাছ থেকে ধার করে বিদেশে গিয়েছিলেন।

এসআরবির দাবি, রাশিয়ায় যাওয়ার পর প্রতিশ্রুত চাকরি না পেয়ে ভুক্তভোগীরা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দেশে ফিরিয়ে আনার অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু তাঁদের ফেরানোর ব্যবস্থা করা হয়নি।

সংস্থাটি জানিয়েছে, এ ঘটনায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং তদন্তকারী সংস্থাকে প্রয়োজনীয় তথ্য ও সাক্ষ্য-প্রমাণ দিয়ে সহায়তা করা হচ্ছে।

তবে ৩০ বাংলাদেশির মধ্যে ২০ জনের মৃত্যুর তথ্য, তাঁদের পরিচয় এবং মানবপাচার চক্রের সংশ্লিষ্টতার বিষয়গুলো এসআরবির প্রাথমিক অনুসন্ধান ও বক্তব্যের ভিত্তিতে উঠে এসেছে। এসব তথ্যের স্বাধীন যাচাই এবং মামলার তদন্তের অগ্রগতি গুরুত্বপূর্ণ।

Leave A Reply


Math Captcha
74 − = 68