Tuesday, October 27

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরকারের প্রণীত গোপনীয়তা আইন আদালতে চ্যালেঞ্জ করেছে দেশটির ২১টি সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ধনকুবের মুকেশ আম্বানি ও গৌতম আদানির মালিকানাধীন সংবাদমাধ্যমও রয়েছে।

সংবাদমাধ্যমগুলোর অভিযোগ, আইনটি অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করতে পারে। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের গোপনীয় তথ্যের উৎস শনাক্ত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

ব্যবহারকারীদের ডিজিটাল ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার কথা বলে গত বছর আইনটি কার্যকরের উদ্যোগ নেয় মোদি সরকার। এর ফলে মেটা ও গুগলের মতো প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানের ওপরও নতুন নিয়ম মানার বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়েছে। তবে সংবাদমাধ্যমগুলোর দাবি, সাংবাদিকদের জন্য বিশেষ ছাড় না থাকায় আইনটি সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে।

সুপ্রিম কোর্টে মামলা

ভারতের ডিজিটাল নিউজ পাবলিশার্স অ্যাসোসিয়েশন (ডিএনপিএ) সুপ্রিম কোর্টে জমা দেওয়া ৬৯৮ পৃষ্ঠার নথিতে বলেছে, সরকার গত আগস্টে এক বৈঠকে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সুরক্ষার আশ্বাস দিলেও সাংবাদিকদের জন্য লিখিতভাবে কোনো ছাড়ের ব্যবস্থা করেনি। সংগঠনটির দাবি, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, সিঙ্গাপুর ও যুক্তরাজ্যে এ ধরনের সুরক্ষা রয়েছে।

গত ৬ অক্টোবর মামলাটি করা হয়। মঙ্গলবার এর শুনানি হওয়ার কথা। মোদি সরকারের গোপনীয়তা আইনের বিরুদ্ধে এটিই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে আলোচিত চ্যালেঞ্জ। এর আগে বাক্‌স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা কয়েকজন অধিকারকর্মী ও কয়েকটি ছোট সংবাদমাধ্যম আইনটির বিরুদ্ধে আদালতে গিয়েছিল।

আম্বানির নেটওয়ার্ক১৮, আদানির এনডিটিভি, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস এবং টাইমস অব ইন্ডিয়া গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠান টাইমস ইন্টারনেট ডিএনপিএর সদস্য।

অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা নিয়ে শঙ্কা

সংবাদমাধ্যমগুলো আইনের বিতর্কিত অধিকাংশ বিধান বাতিলের দাবি জানিয়েছে। এসব বিধান ২০২৭ সালের মে মাস থেকে কার্যকর হওয়ার কথা।

তাদের আশঙ্কা, কোনো ব্যক্তিকে নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করার আগে সাংবাদিকদের তার সম্মতি নিতে হতে পারে। আবার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি পরে সম্মতি প্রত্যাহার করে নিজের তথ্য মুছে ফেলার দাবি জানালে সংবাদমাধ্যমকে প্রকাশিত প্রতিবেদন সরিয়ে নিতে বা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বাদ দিতে বাধ্য করা হতে পারে।

ডিএনপিএ বলেছে, এ ধরনের বিধান অনুসন্ধানী সাংবাদিকতাকে কার্যত নিষ্ক্রিয় করে দিতে পারে। সংগঠনটির মতে, আইনের কিছু বিধান গণতন্ত্রের পরিপন্থী এবং এগুলো আগাম সেন্সরশিপের সুযোগ তৈরি করতে পারে।

সংগঠনটির আশঙ্কা, অনুসন্ধানের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আগে জানিয়ে সম্মতি নিতে হলে তিনি প্রমাণ নষ্ট করতে বা সাক্ষীদের ভয় দেখাতে পারেন। একইভাবে সম্মতি প্রত্যাহার করে তথ্য মুছে ফেলার দাবি জানালে জনস্বার্থে প্রকাশিত সংবাদও সরিয়ে ফেলতে হতে পারে।

তথ্যের উৎস ফাঁসের আশঙ্কা

আইন অনুযায়ী, নিয়ম না মানলে একটি কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ সংবাদমাধ্যমকে জরিমানা করতে পারবে। পাশাপাশি জনস্বার্থের কথা বলে সরকার যেকোনো তথ্য চেয়ে পাঠাতে বা সেই তথ্যের নাগাল বন্ধ করার উদ্যোগ নিতে পারবে। সংবাদমাধ্যমগুলোর মতে, এসব ক্ষমতা সংবাদ প্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত করতে পারে।

মামলার সঙ্গে যুক্ত আগস্টের এক চিঠিতে ডিএনপিএ অভিযোগ করে, ভারত সরকার রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোকে ব্যাপক ছাড় দিলেও সংবাদমাধ্যমের জন্য সমতুল্য সুরক্ষার ব্যবস্থা করেনি।

সংগঠনটির আশঙ্কা, আগামী বছর থেকে সরকার ব্যক্তিগত তথ্য নিয়ে কাজ করা যেকোনো প্রতিষ্ঠানকে প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে নির্দেশ দিতে পারবে। এতে সাংবাদিকদের গোপনীয় উৎস প্রকাশের ঝুঁকি তৈরি হবে। দুর্নীতি, করপোরেট অনিয়ম কিংবা নির্বাচনী কারচুপির তথ্য প্রকাশে আগ্রহী ব্যক্তিরাও এতে নিরুৎসাহিত হতে পারেন।

আম্বানি-আদানি প্রতিষ্ঠানের বিরল চ্যালেঞ্জ

আম্বানি ও আদানির মালিকানাধীন সংবাদমাধ্যমগুলোর এই আইনি পদক্ষেপকে মোদি সরকারের বিরুদ্ধে ব্যবসায়িক গোষ্ঠীগুলোর বিরল চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিরোধী দলগুলো দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, আম্বানি ও আদানি মোদির ঘনিষ্ঠ এবং সরকার তাদের বিশেষ সুবিধা দেয়। তবে ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ও সরকার উভয়েই এ অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।

এদিকে, ২০১৪ সালে মোদি ক্ষমতায় আসার পর ভারতে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা কমেছে বলে অভিযোগ করে আসছেন সমালোচকেরা। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্সের বিশ্ব সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সূচকে চলতি বছর ১৮০টি দেশের মধ্যে ভারতের অবস্থান ১৫৭তম। ২০১৪ সালে দেশটির অবস্থান ছিল ১৪০তম।

তবে ভারত সরকার এই সূচকের মূল্যায়ন প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, দেশটির সংবাদমাধ্যমের পরিবেশ বিস্তৃত ও প্রাণবন্ত এবং এ বিষয়ে বিদেশি সংস্থার স্বীকৃতির প্রয়োজন নেই।

সূত্র: রয়টার্স

Leave A Reply


Math Captcha
45 − 40 =