গাজা উপত্যকায় নতুন করে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। শনিবার রাত থেকে রোববার ভোর পর্যন্ত দক্ষিণ গাজার রাফাহ ও খান ইউনিস, গাজা শহরের দক্ষিণ-পূর্বের জেইতুনসহ একাধিক এলাকায় বিমান, ড্রোন ও কামান হামলা চালানো হয়। এসব হামলায় অন্তত তিনজন ফিলিস্তিনি নিহত এবং সাতজন আহত হয়েছেন। ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে বিদ্যমান ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের এটি সর্বশেষ ঘটনা বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো।
চিকিৎসা সূত্রের বরাতে আলজাজিরা জানায়, খান ইউনিসে হাসপাতালে নেওয়ার পথে একটি ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় এক ফিলিস্তিনি নিহত হন। ফিলিস্তিনি সংবাদ সংস্থা ওয়াফা জানিয়েছে, জেইতুন এলাকার পূর্বে ইসরায়েলি সেনাদের গুলিতে আরও দুজন নিহত হয়েছেন। এছাড়া গাজা শহরের তুফফাহ ও জেইতুন এলাকায় কামান ও সামরিক যান থেকে গুলিবর্ষণের খবরও নিশ্চিত করেছে সংস্থাটি।
ওয়াফা আরও জানায়, মধ্য গাজার বুরেইজ শরণার্থী শিবিরের পূর্বাংশ, উত্তর গাজার জাবালিয়া ও বেইত লাহিয়া এলাকায় ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান থেকে বোমা হামলা চালানো হয়েছে। একই সঙ্গে উত্তর উপকূলীয় এলাকায় ইসরায়েলি যুদ্ধজাহাজ থেকেও গোলাবর্ষণ করা হয়।
গাজা শহর থেকে আলজাজিরার সাংবাদিক তারেক আবু আজ্জুম বলেন, “পরিস্থিতি খুব দ্রুত ভয়াবহ হয়ে উঠছে। গাজা শহরের আকাশে সারাক্ষণ ইসরায়েলি ড্রোনের শব্দ শোনা যাচ্ছে। যুদ্ধবিরতির সীমা হিসেবে নির্ধারিত হলুদ রেখা অতিক্রম করেও হামলা চলছে।”
তিনি আরও জানান, রাফাহ, খান ইউনিসের পূর্বাংশ ও জাবালিয়া শরণার্থী শিবিরে ব্যাপকভাবে ভবন ধ্বংস করা হচ্ছে। এসব এলাকা গত দুই বছর ধরে ইসরায়েলি সেনাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তার মতে, ভবিষ্যৎ আলোচনায় চাপ তৈরির জন্য নিয়ন্ত্রিত এলাকা সম্প্রসারণই এসব হামলার মূল উদ্দেশ্য। যেসব এলাকা থেকে মানুষ আগেই সরে গেছে, সেখানেও বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এতে প্রশ্ন উঠছে—এগুলো কি সত্যিই নিরাপত্তার নামে, নাকি যুদ্ধবিরতির আড়ালে এলাকার মানচিত্র বদলে ফেলার চেষ্টা?
অন্যদিকে, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী দাবি করেছে, উত্তর ও দক্ষিণ গাজায় তিনজন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করা হয়েছে, কারণ তারা ইসরায়েলি সেনাদের জন্য হুমকি ছিল। তাদের একজন সামরিক সরঞ্জাম চুরির চেষ্টা করেছিল বলেও দাবি করা হয়। তবে এসব দাবির সঙ্গে গাজার সূত্রে পাওয়া তথ্যের সরাসরি মিল পাওয়া যায়নি।
শীতে নবজাতকের মৃত্যু, সংকট আরও গভীর
এদিকে, তীব্র শীত ও ইসরায়েলি অবরোধের কারণে গাজায় মানবিক সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। শনিবার মধ্য গাজার দেইর আল-বালাহ এলাকায় সাত দিনের এক নবজাতক ঠান্ডাজনিত কারণে মারা যায়। শিশুটির নাম মাহমুদ আল-আকরা।
অস্থায়ী তাঁবুতে বসবাসকারী ফিলিস্তিনিরা প্রবল বাতাস ও বৃষ্টির মুখে প্রায় অসহায় অবস্থায় রয়েছেন। অধিকাংশ তাঁবু পাতলা কাপড় ও প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি। যুদ্ধবিরতি চুক্তি সত্ত্বেও ইসরায়েল এখনো গাজায় তাঁবু, ভ্রাম্যমাণ ঘর কিংবা তাঁবু মেরামতের উপকরণ ঢুকতে দিচ্ছে না, যা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের শামিল বলে অভিযোগ উঠেছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে গাজায় রাতের তাপমাত্রা নেমে এসেছে ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে।
গাজার সিভিল ডিফেন্স এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, নিম্নচাপের কারণে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং হাজার হাজার তাঁবু পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। ভ্রাম্যমাণ ঘর প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা থাকায় বাসিন্দাদের তাঁবু শক্ত করে বেঁধে রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সোমালিল্যান্ডে স্থানান্তরের অভিযোগ
এদিকে, সোমালিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী আহমেদ মোয়ালিম ফিকি অভিযোগ করেছেন, ইসরায়েল গাজার ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক সোমালিল্যান্ডে স্থানান্তরের পরিকল্পনা করছে। শনিবার আলজাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “আমাদের কাছে নিশ্চিত তথ্য রয়েছে যে, ইসরায়েল ফিলিস্তিনিদের সোমালিল্যান্ডে পাঠানোর পরিকল্পনা করছে। এটি আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন।”

