Friday, January 16

ইরানে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ও লাগামহীন জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে শুরু হওয়া বিক্ষোভ দেশটির শতাধিক শহরে ছড়িয়ে পড়েছে। গত তিন বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় এই গণআন্দোলনে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষে অন্তত ৫ শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সির (এইচআরএএনএ) বরাত দিয়ে বলা হয়, চলমান বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত ৫৩৮ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ৪৯০ জন বিক্ষোভকারী এবং ৪৮ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য। একই সঙ্গে গ্রেপ্তার করা হয়েছে অন্তত ১০ হাজার ৬০০ জনকে।

অন্যদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের বরাতে আলজাজিরা জানিয়েছে, বিক্ষোভকারীদের গুলিতে ১০০ জনের বেশি সরকারি কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। আধা-সরকারি তাসনিম সংবাদ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশজুড়ে বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত ১০৯ জন নিরাপত্তাকর্মী নিহত হয়েছেন।

নিরাপত্তা বাহিনীর হতাহত ও রাষ্ট্রীয় অবস্থান

ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানিয়েছে, ইসপাহান প্রদেশেই পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর ৩০ সদস্য নিহত হয়েছেন। আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর বিশেষ ইউনিটের কমান্ডার জানান, বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার বিভিন্ন শহরে দাঙ্গা দমনের অভিযানে আরও আট সদস্য নিহত হয়েছেন।

গতকাল রোববার নিহত নিরাপত্তা সদস্যদের রাষ্ট্রীয়ভাবে জানাজা ও অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার দৃশ্য সম্প্রচার করে সরকারি টিভি। এ সময় কর্তৃপক্ষ বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে ‘দাঙ্গা’, ‘ভাঙচুর’ ও ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে’ জড়িত থাকার অভিযোগ তোলে।

জাতীয় পুলিশপ্রধান আহমেদ রেজা রাদান বলেন, শনিবার রাতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছে। তবে গ্রেপ্তারের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা জানানো হয়নি।

সরকার বনাম বিক্ষোভকারী

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান দাবি করেছেন, বিদেশি শত্রুরা দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। তবে সরকার জনগণের অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং আলোচনায় প্রস্তুত বলে জানান তিনি।

অন্যদিকে নিরাপত্তা প্রধান আলি লারিজানি বলেন, অর্থনৈতিক দুর্দশার অজুহাতে দাঙ্গা সৃষ্টি করা হচ্ছে, যা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

ইরানের বিপ্লবী গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) বিক্ষোভের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দায়ী করে সতর্ক করে দিয়েছে— হামলা হলে কঠোর প্রতিশোধ নেওয়া হবে।

যুক্তরাষ্ট্র–ইরান উত্তেজনা

নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে সামরিক হামলার অনুমোদনের বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করছেন। তবে মার্কিন সামরিক কমান্ডাররা সম্ভাব্য ইরানি পাল্টা হামলার আশঙ্কায় প্রস্তুতির জন্য আরও সময় চেয়েছেন।

এদিকে ইরানের সংসদের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে ইরান দখলকৃত অঞ্চল ও মার্কিন সামরিক ঘাঁটিকে বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করবে।

ইন্টারনেট বন্ধ, প্রকৃত হতাহতের আশঙ্কা

আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট পর্যবেক্ষণ সংস্থা নেটব্লকস জানায়, ইরানে টানা ৬০ ঘণ্টার বেশি সময় ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ ছিল। এতে তথ্যপ্রবাহ সীমিত হওয়ায় প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বিবিসি পার্সিয়ান জানিয়েছে, বিভিন্ন হাসপাতালে মৃতদেহের সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। রাশত ও তেহরানের হাসপাতালে এক রাতেই শতাধিক মৃতদেহ আনার তথ্য পাওয়া গেছে।

বিক্ষোভের পেছনের কারণ

ডিসেম্বরের শেষ দিকে ইরানি রিয়ালের ভয়াবহ দরপতনের মধ্য দিয়ে বিক্ষোভের সূত্রপাত হয়। বর্তমানে এক মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইরানি রিয়াল ১৪ লাখ ২০ হাজারে নেমে এসেছে, যা ছয় মাসে প্রায় ৫৬ শতাংশ অবমূল্যায়ন।

ভয়াবহ মুদ্রাস্ফীতির কারণে খাদ্যপণ্যের দাম গড়ে ৭২ শতাংশ বেড়েছে। দুগ্ধজাত পণ্যের দাম ছয় গুণ এবং কিছু নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে ১০ গুণেরও বেশি। ফলে এই অর্থনৈতিক বিক্ষোভ দ্রুত রাজনৈতিক ও সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নিয়েছে।

নজিরবিহীন গণআন্দোলন

এএফপির মতে, ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর ইরানে যে কয়টি বড় গণআন্দোলন হয়েছে, এটি তার অন্যতম। এই আন্দোলন সরাসরি সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির শাসনব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।

Leave A Reply


Math Captcha
+ 16 = 26