গাজায় ছয় বছর ধরে ক্যান্সারে ভুগছেন হানি নাইম। তবে তাঁর অপেক্ষা এখন আর সুস্থ হওয়ার জন্য নয়—জীবন বাঁচাতে গাজা ছাড়ার অনুমতির জন্য। বিদেশে চিকিৎসার অনুমোদন থাকলেও কঠোর ইসরায়েলি নিষেধাজ্ঞার কারণে হাজারো মানুষের মতো তিনিও গাজায় আটকে আছেন।
আলজাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে হানি নাইম বলেন, “আগে আমি পশ্চিম তীর ও জেরুজালেমে চিকিৎসা নিতাম। এখন কোনো চিকিৎসাই পাচ্ছি না। আমার রেডিওথেরাপি প্রয়োজন, কিন্তু গাজায় তার কোনো ব্যবস্থা নেই।”
বর্তমানে গাজায় প্রায় ১১ হাজার ক্যান্সার রোগী চিকিৎসাহীন অবস্থায় রয়েছেন। উপত্যকার স্বাস্থ্যব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়েছে। চিকিৎসকদের মতে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরায়েলের নির্বিচার হামলা শুরুর পর ক্যান্সারে মৃত্যুর সংখ্যা তিন গুণ বেড়েছে। কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপির অভাব এবং বাইরে যাওয়ার পথ বন্ধ থাকায় অনেক রোগীর জন্য ক্যান্সার শনাক্ত হওয়াই কার্যত মৃত্যুদণ্ডে পরিণত হয়েছে।
ধ্বংসস্তূপে পরিণত ‘ভূতুড়ে হাসপাতাল’
একসময় গাজার একমাত্র বিশেষায়িত ক্যান্সার চিকিৎসাকেন্দ্র ছিল তুরস্ক-ফিলিস্তিন মৈত্রী হাসপাতাল। বর্তমানে সেটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। সাংবাদিক আবু আজ্জুম জানান, যুদ্ধের সময় হাসপাতালটিকে সামরিক ঘাঁটিতে রূপান্তর করা হয় এবং পরে ইসরায়েলি বাহিনী সেটি গুঁড়িয়ে দেয়। ফলে ক্যান্সার রোগীরা সম্পূর্ণ অসহায় হয়ে পড়েছেন।
আলজাজিরাকে গাজা ক্যান্সার সেন্টারের মেডিকেল ডিরেক্টর মোহাম্মদ আবু নাদা বলেন, “আমরা ক্যান্সার শনাক্ত ও চিকিৎসার একমাত্র হাসপাতালটি হারিয়েছি। এখন নাসের মেডিকেল কমপ্লেক্সে কাজ করছি, কিন্তু সেখানে রোগ নির্ণয়ের যন্ত্র বা কেমোথেরাপির ব্যবস্থা নেই।”
‘চকলেট আছে, ওষুধ নেই’
যুদ্ধবিরতির পর গাজায় ত্রাণ প্রবেশের কথা থাকলেও জরুরি চিকিৎসাসামগ্রী এখনও ঢুকতে দেওয়া হয়নি। আবু নাদা বলেন, “কিছু বাণিজ্যিক পণ্য ঢুকেছে, কিন্তু জীবন রক্ষাকারী ওষুধ নয়। চকলেট, বাদাম, চিপস এসেছে—কিন্তু ক্যান্সার চিকিৎসার ওষুধ ও যন্ত্রপাতি আসেনি। এটি কেবল প্রচারণা।”
তিনি জানান, শুধু খান ইউনুস এলাকাতেই প্রতিদিন দুই থেকে তিনজন ক্যান্সার রোগী মারা যাচ্ছেন। “ক্যান্সার শরীরে আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ছে। আমরা ক্যান্সার চিকিৎসায় অন্তত ৫০ বছর পিছিয়ে গেছি,” বলেন তিনি।
বর্তমানে ৩ হাজার ২৫০ জন ক্যান্সার রোগীর বিদেশে চিকিৎসার সরকারি রেফারেল রয়েছে। তবে রাফাহ ক্রসিং বন্ধ এবং ইসরায়েলি নিষেধাজ্ঞার কারণে তারা সীমান্ত পার হতে পারছেন না।
যুদ্ধবিরতির মধ্যেও হামলায় নিহত ১৩
গাজার সিভিল ডিফেন্স জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও গত বৃহস্পতিবার ইসরায়েলের হামলায় পাঁচ শিশুসহ অন্তত ১৩ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। দক্ষিণ গাজায় বাস্তুচ্যুত মানুষের একটি তাঁবুতে ড্রোন হামলায় তিন শিশুসহ চারজন নিহত হন। উত্তরের জাবালিয়া শরণার্থী শিবিরের কাছে ১১ বছর বয়সী এক কিশোরী নিহত হয়। এছাড়া একটি স্কুল ও খান ইউনুসের কাছে পৃথক ড্রোন হামলায় আরও দুজন নিহত হন। পরে গাজা সিটির পূর্বাঞ্চলে একটি বাড়িতে বিমান হামলায় আরও চারজনের মৃত্যু হয়।

