নিজস্ব প্রতিবেদক
মাস দুয়েক পূর্বে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অস্বচ্ছতার অভিযোগে আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের জুনিয়র পর্যায়ের ৫৫০ জন কর্মকর্তার চাকুরীচ্যুতি ও চাকুরী ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিতে আন্দোলনের ঘটনা সারাদেশে আলোচিত হলেও বহাল তবিয়তে আছেন অভিনব ও চাঞ্চল্যকর নিয়োগ জালিয়াতিতে অভিযুক্ত একজন নির্বাহী।
তিনি ব্যাংকের সাবেক দুই চেয়ারম্যানের প্রভাবশালী ব্যক্তিগত সচিব হওয়ায় তার বিরুদ্ধে কোন প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ না করে বরং প্রথমে চেয়ারম্যান সেক্রেটারিয়েট থেকে রিটেইল ডিভিশন, পরবর্তীতে গত ৬ অক্টোবর আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক ফাউন্ডেশনে বদলী করা হয়। বিষয়টি নিয়ে ব্যাংকের অভ্যন্তরে সমালোচনা শুরু হলে গত ১৫ ডিসেম্বর তাঁকে নগরীর উত্তরা মডেল টাউন শাখায় বদলী করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষায় অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলেও অদৃশ্য কারণে তা উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে সমর্পণ করা হচ্ছে না। চট্টগ্রামের একটি প্রভাবশালী শিল্পগ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ২০২১ সালে এই ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত হলে তাঁর মালিকানাধীন গার্মেন্টসের একজন কর্মকর্তাকে ব্যাংকে নিয়মবহির্ভূতভাবে নিয়োগ দেন। অভিযুক্ত নির্বাহীর নাম কাজী শাহেদ জামিল (আইডি নং-০০৭৫৫০)। তিনি বর্তমানে ব্যাংকের পরিচালনাধীন এআইবি ফাউন্ডেশনে এসএভিপি পদে কর্মরত আছেন। চাকুরীবিধির কোন প্রকার নিয়মকানুন না মেনে এই চেয়ারম্যানের অধীনেই চাকুরীচ্যুত ৫৫০জন কর্মকর্তাকে ব্যাংকে নিয়োগ করা হয়। চেয়ারম্যানের পিএস হিসেবে এই নিয়োগের বাছাই প্রক্রিয়ায় নিযুক্ত ছিলেন অভিযুক্ত শাহেদ জামিল।
এই সংক্রান্ত নিরীক্ষা রিপোর্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রধান কার্যালয়ের মানব সম্পদ বিভাগের সূত্র নং এআইবিএলপিএলসি/এইচও/এইচআরডি/ডিসিপ্লিন/২০২৫/২২৩ তারিখঃ ১০.০৭.২০২৫ পত্রমূলে প্রেরিত পত্রের প্রেক্ষিতে ব্যাংকের নিরীক্ষা ও পরিদর্শন বিভাগের পত্র সূত্র নং- এআইবিএল/প্রকা/আইসিসি উইং/এএন্ডআই/২০২৫/১৪৬ তারিখঃ ১৩.০৭.২০২৫ এর মাধ্যমে উক্ত বিষয়ে নিরীক্ষা ও পরিদর্শন কার্যক্রম সম্পাদন করা হয়।
প্রতিবেদনে প্রকাশ, অভিযুক্ত মোঃ কাজী শাহেদ জামিলের কোন প্রকার ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও, যথাযথভাবে নিয়োগ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে তাকে ব্যাংকের সিনিয়র এক্সিকিউটিভ অফিসার (এসইও) পদে নিযুক্ত করা হয়। তাঁর ব্যক্তিগত নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, প্রধান কার্যালয়ের মানব সম্পদ বিভাগের পত্র সূত্র নং এআইবিএল/এইচও/এইচআরডি/২০২১/১৪৫৪ তারিখ ১২.০৮.২০২১ এর মাধ্যমে জনাব কাজী শাহেদ জামিলকে সিনিয়র এক্সিকিউটিভ অফিসার (এসইও) হিসেবে নিয়োগপত্র দেওয়া হয়। নিয়োগপত্র পাওয়ার পর জনাব কাজী শাহেদ জামিল ১৯.০৮.২০২১ তারিখে ব্যাংকের মানব সম্পদ বিভাগে যোগদান করেন। ১৯.০৮.২০২১ তারিখেই শাহেদকে ব্যাংকের মানব সম্পদ বিভাগ হতে ই-আইডি নং ০০৫৭৮১ প্রদানের মাধ্যমে মাননীয় চেয়ারম্যান মহোদয়ের সচিবালয়ে ব্যক্তিগত সচিব (পিএস) হিসেবে বদলি করা হয়।
নিরীক্ষা ও পরিদর্শনে যে অনিয়ম পরিলক্ষিত হয় তা হলো, ব্যাংকের এমপ্লয়েজ সার্ভিস রুলস ১৯৯৫ (এমন্ডেড ২০২০) এর ২.১৭.৩ এর ১২ ক্রমিক অনুযায়ী ব্যাংকের মাননীয় ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহোদয় কোন যোগ্য অফিসার/ব্যক্তিকে সিনিয়র এক্সিকিউটিভ অফিসার (এসইও) হিসেবে নিয়োগ দিতে পারবেন সেক্ষেত্রে উক্ত অফিসার/ব্যক্তিকে তিন বছর ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা এর মধ্যে দুই বছর এক্সিকিউটিভ অফিসার (ইও) অথবা সমমর্যাদার পদে চাকুরীর অভিজ্ঞতা থাকতে হবে এবং বয়স ৩৩ বছরের বেশি হতে পারবে না। কিন্তু ব্যাংকের মানব সম্পদ বিভাগে রক্ষিত কাজী শাহেদ জামিলের ব্যক্তিগত ফাইল পরিদর্শনে দেখা যায়, তিনি ইতোপূর্বে কেডিএস গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘ পনের বছর চাকুরী করেছেন। কিন্তু ব্যাংকে চাকুরী করার কোন অভিজ্ঞতা নাই। অন্যদিকে চাকুরীতে যোগদানের সময় তার বয়স ছিল ৩৮ বছর ৯ মাস ২৪ দিন। অর্থাৎ জনাব কাজী শাহেদ জামিলের কোন প্রকার ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও, যথাযথভাবে নিয়োগ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে তাকে ব্যাংকের সিনিয়র এক্সিকিউটিভ অফিসার (এসইও) হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে যা এমপ্লয়েজ সার্ভিস রুলস ১৯৯৫ (এমন্ডেড ২০২০) এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
সার্ভিস রুলসের ২.৬.৭ এর ধারা ১০ অনুযায়ী “ডকুমেন্টেশন রিকুইয়ারমেন্টস” এ যে সকল সার্টিফিকেটের মূল কপি/এটস্টেড কপি ব্যাংকে জমা দেওয়ার বিধান রয়েছে তন্মেধ্যে কাজী শাহেদ জামিল ব্যাংকে যোগদানের সময় সব সার্টিফিকেটের মূল কপি/এটস্টেড কপি ব্যাংকে জমা দেননি। পরবর্তীতে, ২০২৩ সালে কাজী শাহেদ জামিলকে সিনিয়র এক্সিকিউটিভ অফিসার (এসইও) থেকে চারটি গ্রেড অতিক্রম করে সরাসরি সিনিয়র এসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট (এসএভিপি) পদে অর্থাৎ একসাথে ০৫ (পাঁচটি) প্রমোশন দেওয়া হয়।
একজন কর্মকর্তাকে একসাথে পাঁচটি প্রমোশন বাংলাদেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে বিরল, নজিরবিহীন ও বৈষম্যমূলক। কাজী শাহেদ জামিল ১৯.০৮.২০২১ তারিখে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক পিএলসিতে সিনিয়র এক্সিকিউটিভ অফিসার (এসইও) পদে যোগদান করার ১ বছর ৮ মাস ২৮ দিন পর অর্থাৎ ১৭.০৫.২০২৩ তারিখে ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগে পদত্যাগপত্র দাখিল করেন। ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগ ১৭.০৫.২০২৩ তারিখে পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেন এবং ১৭.০৫.২০২৩ তারিখেই ব্যাংকের চাকুরী হতে অব্যাহতি (রিলিজ) প্রদান করেন। কাজী শাহেদ জামিলকে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ অব্যাহতি (রিলিজ) এর দিনেই অর্থাৎ ১৭.০৫.২০২৩ তারিখেই নতুন ইআইডি নং ০০৭৫৫০ দিয়ে ৭টি ইনক্রিমেন্টসহ সিনিয়র এসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট (এসএভিপি) পদে নিয়োগ দেন। এমপ্লয়েজ সার্ভিস রুলস ১৯৯৫ (এমন্ডেড ২০২০) এর ৭.২.১ অনুযায়ী শাহেদ জামিল ১৭.০৫.২০২৩ তারিখে ব্যাংকের চাকুরী হতে পদত্যাগ করলেও নিয়মানুযায়ী ৩ মাসের নোটিশ বা তিন মাসের মূল বেতন/সমপরিমান টাকা ব্যাংকে জমা দেওয়ার নিয়ম থাকলেও তিনি জমা দেননি কিংবা ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহোদয়ের নিকট উক্ত টাকা মওকুফের বিষয়ে আবেদন করেননি।
অর্থাৎ ব্যাংকের চাকুরী হতে পদত্যাগের ক্ষেত্রে তিনি ব্যাংকের সার্ভিস রুলস এর ৭.২.১ ধারা লঙ্ঘন করেছেন। অন্যদিকে ব্যাংকের মানব সম্পদ বিভাগ হতে ৩ মাসের নোটিশ বা তিন মাসের মূল বেতন/সমপরিমান টাকা ১.০০ লক্ষ (৩৩৬০০*৩) আদায় ব্যতিত পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছেন এবং চাকুরী হতে অব্যাহতি দিয়েছেন এমনকি সার্ভিস বেনিফিট প্রদান করার সময়ও উক্ত ১.০০ লক্ষ টাকা আদায় না করেই সম্পূর্ণ টাকা প্রদান করেছেন যা ব্যাংকের সার্ভিস রুলসের ধারা নং ৭.২.১ এর বিধানের লঙ্ঘন।
কাজী শাহেদ জামিলকে নিয়মবহির্ভূতভাবে একবারে পাঁচটি প্রমোশন ও সাতটি ইনক্রিমেন্ট দেওয়ার জন্যই চতুরতার আশ্রয় গ্রহণ করা হয়েছে এবং নিয়মবহির্ভূতভাবে একই দিনে পদত্যাগ, অব্যাহতি এবং নতুনভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া সার্ভিস রুলস এর ২.১৭.৩ এর ৭ ক্রমিক অনুযায়ী মাননীয় ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহোদয় কোন যোগ্য অফিসার/ব্যক্তিকে সিনিয়র এসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট (এসএভিপি) হিসেবে নিয়োগ দিতে
পারবেন সেক্ষেত্রে উক্ত অফিসার/ব্যক্তিকে বার বছর ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা এর মধ্যে দুই বছর এসএভিপি অথবা সমমর্যাদার পদে চাকুরীর অভিজ্ঞতা থাকতে হবে এবং বয়স ৪৫ বছরের বেশি হতে পারবে না। কাজী শাহেদ জামিল মাত্র এক বছর আট মাস আটাশ দিন ব্যাংকে এসইও হিসেবে চাকরী করেছেন। অর্থাৎ কাজী শাহেদ জামিলের নিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যাংকিং অভিজ্ঞতার বিষয় বিবেচনা না করে সিনিয়র এসিস্ট্যান্ট ভাইস
প্রেসিডেন্ট (এসএভিপি) পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে যা সার্ভিস রুলসের পরিপন্থী। সার্ভিস রুলসের ১৩.৩ অনুযায়ী কাজী শাহেদ জামিলকে ৭টি ইনক্রিমেন্টসহ সিনিয়র এসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট (এসএভিপি) পদে পুনঃনিয়োগ দিলেও বোর্ড হতে কোন অনুমোদন নেওয়া হয়নি।
এই ব্যাপারে ব্যাংকের জনসংযোগ বিভাগের প্রধান জালাল আহমেদের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা বিভাগের মাধ্যমে বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসাইন খান জানান, যদি এ ধরণের অভিযোগ সত্যি হয়ে থাকে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে তদন্ত পূর্বক ব্যবস্থা নেয়া হবে।

