সংবাদ প্রকাশ, অনিয়ম-দুর্নীতির তথ্য তুলে ধরা এবং পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বিভিন্ন সময়ে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন ময়মনসিংহ অঞ্চলের পাঁচ সাংবাদিক। এসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বিচার প্রক্রিয়ার অগ্রগতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রিয়জনকে হারিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় থাকা পরিবারগুলোর মধ্যেও বিরাজ করছে উৎকণ্ঠা।
সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন করে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সাংবাদিক হত্যার ঘটনাগুলো শুধু কয়েকটি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি নয়; বরং সত্য প্রকাশের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্যও গভীর যাতনার বিষয়।
সাংবাদিকতা পেশার মূল দায়িত্ব হলো মানুষের কথা তুলে ধরা, অনিয়ম-দুর্নীতির তথ্য অনুসন্ধান করা এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো জনগণের সামনে প্রকাশ করা। কিন্তু এসব দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কোনো সাংবাদিককে যদি প্রাণ দিতে হয়, তাহলে তা স্বাধীন সাংবাদিকতা ও মতপ্রকাশের অধিকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
ময়মনসিংহ অঞ্চলের সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের বিষয়টি সামনে আসার সঙ্গে সঙ্গে হত্যাকাণ্ডগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত, বিচার এবং দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পেশাগত দায়িত্ব পালনের কারণে সাংবাদিকদের ওপর হামলা, ভয়ভীতি প্রদর্শন কিংবা হত্যার অভিযোগ থাকলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করা প্রয়োজন। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব নয়; প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান ও সমাজেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
সাংবাদিকদের ওপর হামলা কিংবা হত্যার ঘটনায় বিচারহীনতার অভিযোগ থাকলে তা দূর করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন মহল। তাঁদের মতে, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা এবং জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশের পরিবেশ নিশ্চিত করতে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য।
মামলার তদন্ত, অভিযোগপত্র, সাক্ষ্যগ্রহণ ও বিচারিক কার্যক্রমের অগ্রগতি সম্পর্কে ভুক্তভোগী পরিবারকে নিয়মিত তথ্য জানানো প্রয়োজন। দীর্ঘসূত্রতা বা বিচার নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে পরিবারের সদস্যদের মানসিক চাপ বাড়তে পারে। পাশাপাশি সাংবাদিকদের মধ্যেও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তবে সংশ্লিষ্ট পাঁচটি মামলার বর্তমান অবস্থা, বিচারাধীন থাকার কারণ এবং তদন্তের অগ্রগতি আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসন, বিচার বিভাগ এবং গণমাধ্যমসংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। বিশেষ করে মামলাগুলোর অগ্রগতি পর্যালোচনা, সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, প্রমাণ সংরক্ষণ এবং ভুক্তভোগী পরিবারকে আইনি সহায়তা দেওয়ার বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার।
যেসব পরিবার সাংবাদিক হত্যার ঘটনায় স্বজন হারিয়েছে, তাদের কাছে ন্যায়বিচার শুধু একটি আইনি প্রক্রিয়ার বিষয় নয়; এটি প্রিয়জনের হত্যার প্রকৃত কারণ জানা এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় দেখার প্রত্যাশাও। তাই মামলাগুলোর প্রকৃত অবস্থা জনসমক্ষে তুলে ধরা এবং বিচার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।
ময়মনসিংহ অঞ্চলে পেশাগত দায়িত্ব পালনে বিভিন্ন সময়ে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন পাঁচ সাংবাদিক। তাঁদের মধ্যে কেউ গুলিতে, কেউ ধারালো অস্ত্রের আঘাতে, আবার কেউ সন্ত্রাসীদের হামলায় গুরুতর আহত হওয়ার পর দীর্ঘদিনের শারীরিক যন্ত্রণা নিয়ে মারা গেছেন। এসব হত্যাকাণ্ডের পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও বিচার নিয়ে অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিন কাটছে নিহত সাংবাদিকদের পরিবারের সদস্যদের।
নিহত সাংবাদিকেরা হলেন নেত্রকোনার দুর্গাপুরের লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির, ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ার আসাদুজ্জামান তুহিন, জামালপুরের বকশীগঞ্জের গোলাম রব্বানী নাদিম, ময়মনসিংহের স্বপন কুমার ভদ্র ও জামালপুরের শেলু আকন্দ।
এদিকে সাংবাদিকদের ওপর হামলা, হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনায় বিচার নিশ্চিত করার দাবিতে সরব হয়েছে সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ সেল বাংলাদেশ। সংগঠনটির নেতারা বলছেন, এসব হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে নিহত সাংবাদিকদের পরিবারকে আইনি সহায়তা দিতে হবে। এ দাবিতে রাজপথে আন্দোলনেরও ঘোষণা দিয়েছেন তাঁরা।
লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল রূপসী বাংলার প্রতিনিধি এবং পাশাপাশি অনুসন্ধানী ফেসবুক পেজ ডিটেকটিভ আর্টিকেল পরিচালনা করতেন। দুর্গাপুরের সোমেশ্বরী নদীর বালুঘাটসহ স্থানীয় বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করতেন তিনি। ২০২৬ সালের ১৫ অক্টোবর রাতে নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার শ্যামগঞ্জ-বিরিশিরি সড়কের তেলনজিয়া বাজারে একটি চায়ের দোকানের সামনে তাঁকে গুলি করে হত্যা করা হয়। মোটরসাইকেলে আসা দুর্বৃত্তরা তাঁকে লক্ষ্য করে উপর্যুপরি গুলি ছুড়ে পালিয়ে যায়। স্থানীয় অনিয়ম নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের জেরে পূর্বশত্রুতার কারণে এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার সন্তান আসাদুজ্জামান তুহিন দৈনিক প্রতিদিনের কাগজের স্টাফ রিপোর্টার ছিলেন। ২০২৫ সালের ৭ আগস্ট রাতে গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তা এলাকায় তাঁকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ঘটনার রাতে একটি মারধরের ঘটনা মুঠোফোনে ধারণ করেছিলেন তুহিন। স্থানীয় সন্ত্রাসীরা তাঁকে ভিডিওটি মুছে ফেলতে বলে। কিন্তু সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে ভিডিও মুছতে অস্বীকৃতি জানান তিনি। এরপর তাঁকে ধাওয়া করে একটি চায়ের দোকানে অবরুদ্ধ করা হয়। সেখানে চাপাতি ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে তাঁকে হত্যা করা হয়।
গোলাম রব্বানী নাদিম অনলাইন সংবাদমাধ্যম বাংলানিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের জামালপুর জেলা প্রতিনিধি ছিলেন। জামালপুরের বকশীগঞ্জে স্থানীয় এক ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের দুর্নীতি ও বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করেছিলেন তিনি। ২০২৩ সালের ১৪ জুন রাতে পেশাগত দায়িত্ব পালন শেষে বাড়ি ফেরার পথে বকশীগঞ্জ উপজেলার পাটহাটি এলাকায় হামলার শিকার হন নাদিম। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরদিন ১৫ জুন ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ও তাঁর অনুসারীদের বিরুদ্ধে হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে।
প্রবীণ সাংবাদিক স্বপন কুমার ভদ্র স্থানীয় একটি পত্রিকায় কাজ করতেন। ময়মনসিংহের শম্ভুগঞ্জ ও রঘুরামপুর এলাকায় মাদক ব্যবসা ও চোরাচালান নিয়ে নিয়মিত লিখতেন তিনি। ২০২৪ সালের ১২ অক্টোবর বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ময়মনসিংহের শম্ভুগঞ্জ বাজারের মাঝিপাড়া এলাকায় তাঁকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। মাদক ব্যবসায়ী ও অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে লেখালেখির কারণে তিনি ক্ষুব্ধ ব্যক্তিদের আক্রোশের শিকার হয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
জামালপুরের সাংবাদিক শেলু আকন্দ দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকার জেলা প্রতিনিধি এবং জামালপুর পল্লীকণ্ঠ প্রতিদিনের স্টাফ রিপোর্টার ছিলেন। স্থানীয় ভূমিদস্যু ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত একটি চক্রের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করেছিলেন তিনি। ২০১৯ সালের ১৮ ডিসেম্বর রাতে জামালপুর শহরের দেওয়ানপাড়া এলাকায় তাঁর ওপর হামলা হয়। হামলাকারীরা লোহার রড দিয়ে পিটিয়ে তাঁর দুই পা গুরুতরভাবে জখম করে। এরপর দীর্ঘ পাঁচ বছর পঙ্গুত্ব ও শারীরিক-মানসিক যন্ত্রণা ভোগ করেন তিনি। ২০২৪ সালের ১৮ ডিসেম্বর তাঁর মৃত্যু হয়।
সাংবাদিক হত্যার প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, নিরপেক্ষ বিচার এবং দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা হোক—এটাই ভুক্তভোগী পরিবার ও সাংবাদিক সমাজের ন্যায়বিচার প্রত্যাশার মূল দাবি।
বাংলাদেশ সাংবাদিক সমিতির (বাসাস) কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক এনামুল হক বাবুল ও সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ সেলের চেয়ারম্যান খায়রুল আলম রফিক বলেন, ময়মনসিংহ অঞ্চলের গণমাধ্যম এখন কঠিন সময় পার করছে। সাংবাদিক তুহিন, আলিফ, নাদিম, স্বপন ভদ্র ও শেলু আকন্দের হত্যাকাণ্ড স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর আঘাত।
তাঁরা আরও বলেন, ‘আমরা এই পাঁচ সাংবাদিক হত্যার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে নিষ্পত্তি চাই।’ এসব হত্যাকাণ্ডের বিচার দ্রুত সম্পন্ন করার পাশাপাশি নিহত সাংবাদিকদের পরিবারের নিরাপত্তা ও আইনি সহায়তা নিশ্চিত করার দাবিও জানিয়েছেন ওই সাংবাদিক নেতারা।

